বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের অধীনে ছড়িয়ে থাকা সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ‘পরিবার কার্ড’ কর্মসূচি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোকে একটি অভিন্ন তথ্যভান্ডারের আওতায় এনে তাদের যোগ্যতা যাচাই করা হবে। এরপর নির্ধারিত পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক নারী সদস্যের নামে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
এই কর্মসূচিকে দেশব্যাপী বাস্তবায়নের আগে পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, জরিপ পরিচালনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২,৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প। এর মধ্যে ৯০০ কোটি টাকা আসবে বিশ্বব্যাংকের সামাজিক সুরক্ষাবিষয়ক একটি কর্মসূচি থেকে এবং বাকি ১,৫০০ কোটি টাকা দেবে সরকার।
পরিকল্পনা শুধু বর্তমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নগদ সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে সরকার এমন একটি জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করতে চায়, যেখান থেকে ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচন, একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নিচ্ছেন কি না তা যাচাই এবং প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হবে।
১৬ আগস্ট শুরু হচ্ছে আনুষ্ঠানিক যাত্রা
পরিবার কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ আগস্ট ২০২৬। কিশোরগঞ্জ থেকে কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর উদ্বোধন করবেন।
তবে জাতীয় পর্যায়ে উদ্বোধনের আগেই কিশোরগঞ্জের লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে নতুন তথ্যভান্ডার, সফটওয়্যার ও অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে। এই পরীক্ষায় প্রযুক্তিগত কোনো ত্রুটি, তথ্য যাচাইয়ের সমস্যা কিংবা মাঠপর্যায়ের জটিলতা পাওয়া গেলে সেগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী ধাপে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়নে এই কার্যক্রম পৌঁছে দেওয়া। জরিপ কতটা সফল ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়, তার ওপর নির্ভর করে অক্টোবরের শেষ নাগাদ পুরো দেশে এর কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও পরিবার কার্ডের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কর্মসূচিটিকে উচ্চ অগ্রাধিকারের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রথম বছরে ৪১ লাখ পরিবার
সরকার পরিবার কার্ড একসঙ্গে সব পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে কয়েকটি ধাপে এর আওতা বাড়াতে চায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবার এই কর্মসূচির আওতায় আসবে। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৭-২৮ সালে পরিবারসংখ্যা বেড়ে হবে ৮১ লাখ।
এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ কোটি ২১ লাখ পরিবার এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে মোট ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে পরিবার কার্ড ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই হিসাবে আগামী কয়েক বছরে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।
তবে এত বড় সংখ্যক পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন কতটা নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভুল ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়া, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা পাওয়া এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের মাধ্যমে তালিকায় নাম ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
পরিবার কার্ডের নতুন তথ্যভিত্তিক পদ্ধতি এসব সমস্যা কতটা কমাতে পারে, সেটিই হবে কর্মসূচিটির সাফল্যের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
টাকার নিয়ন্ত্রণ থাকবে পরিবারের নারীর হাতে
নতুন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো, যোগ্য পরিবারের আর্থিক সহায়তা পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক নারী সদস্যের নামে দেওয়া হবে।
সরকারের ধারণা, পরিবারের নারীর হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছালে খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণও শক্তিশালী হতে পারে।
এর একটি উদাহরণ দেখা গেছে পটুয়াখালীর গলাচিপায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে।
গলাচিপার একটি নিম্নাঞ্চলীয় দ্বীপ এলাকায় বসবাসকারী ৩২ বছর বয়সী তানজিলা বেগমের পরিবার ভূমিহীন। তাঁর স্বামী মূলত দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। বিশেষ করে তরমুজের মৌসুমে কৃষিকাজ করে আয় করেন তিনি। তানজিলাও অন্যের বাড়িতে কাজ করে পরিবারের আয়ে সহযোগিতা করেন।
কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় কাজের নিশ্চয়তা সবসময় থাকে না। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষিকাজ বন্ধ করে দিলে পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবার কার্ডের পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে তানজিলা এখন প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা পাচ্ছেন। সেই অর্থের মধ্যে তিনি ৫০০ টাকা ভবিষ্যতের জরুরি সময়ের জন্য জমিয়ে রাখছেন। বাকি টাকা পরিবারের খাবার এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া সন্তানের শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করছেন।
তানজিলার মতো গলাচিপা উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পর্যায়ে ৮০৮ জন সুবিধাভোগী এই সহায়তা পেয়েছেন।
এই ছোট উদাহরণটি পরিবার কার্ডের সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ। মাসে ২,৫০০ টাকা একটি পরিবারের সব সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। কিন্তু যাদের আয় অনিয়মিত এবং দুর্যোগের কারণে হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জরুরি সময়ে কিছুটা নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে।
উপকূলের দরিদ্র পরিবারের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
পটুয়াখালীর গলাচিপার অনেক পরিবার মাছ ধরা, কৃষিকাজ এবং তরমুজ চাষের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের আয় একই রকম থাকে না। বছরের একেক সময়ে একেক রকম কাজ পাওয়া যায়।
গলাচিপার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজার মো. ইজাজুল হক জানিয়েছেন, এলাকার বড় একটি অংশের মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন এবং তাদের জীবিকা মূলত কৃষি ও মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত।
এই ধরনের এলাকায় নগদ সহায়তার অর্থ শুধু মাসিক কিছু টাকা পাওয়া নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর কয়েক দিন কাজ না পাওয়া, ফসল নষ্ট হওয়া কিংবা পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে অল্প সঞ্চয়ও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবার কার্ড যদি নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে অর্থ পৌঁছাতে পারে, তবে উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার অনেক পরিবারের জন্য এটি একটি ন্যূনতম আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করতে পারে।
৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য নেওয়ার পরিকল্পনা
পরিবার কার্ড কর্মসূচির সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে দেশব্যাপী পরিবারভিত্তিক জরিপ।
এই জরিপে ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীকে পরিবারভিত্তিক একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা হিসেবেও এই জরিপকে দেখা যেতে পারে।
জরিপ পরিচালনার জন্য মাঠে নামানো হবে ৬৬,৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী। তাদের কাজ তদারক করবেন ৬,৬৮১ জন মাঠ তত্ত্বাবধায়ক।
এই কাজের প্রতি চাকরিপ্রত্যাশীদের আগ্রহও বেশ বেশি। দেশের ৫৮৩টি সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহকারীর পদের জন্য ৪,৬৯,১০৩টি আবেদন জমা পড়েছে।
তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রতিটি পরিবারের তথ্য নেওয়ার জন্য ১৬৫ টাকা করে পাবেন। আর তত্ত্বাবধায়কেরা প্রতিটি তথ্য যাচাইয়ের জন্য পাবেন ৩০ টাকা।
শুধু গলাচিপাতেই ১০৩ জন তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এত বড় জরিপের সাফল্য নির্ভর করবে তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে যাচাই, প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং স্থানীয় প্রভাবমুক্তভাবে তথ্য নেওয়ার ওপর।
কাগজের বদলে মোবাইলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ
পরিবার কার্ডের জরিপকে প্রচলিত কাগজভিত্তিক জরিপের মতো রাখা হচ্ছে না। মাঠকর্মীরা মোবাইলভিত্তিক ব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহ করবেন।
একটি পরিবারের তথ্য নেওয়ার সময় অবস্থান নিশ্চিত করতে সরাসরি ভৌগোলিক অবস্থান যুক্ত করা হবে। পরিবারের বসবাসের অবস্থা বোঝার জন্য ছবি নেওয়া হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাক্ষরও সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
পটুয়াখালী সমাজসেবা বিভাগের উপপরিচালক আবদুর রশিদ খান জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ পুরোপুরি কাগজবিহীন ব্যবস্থার মাধ্যমে করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পরিবারের দেওয়া তথ্য এবং বাস্তব বসবাসের অবস্থার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে তা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো পরিবার খুব কম আয় দাবি করলেও তাদের জীবনযাত্রা বা সম্পদের তথ্য যদি সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে বিষয়টি পুনরায় যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত হতে পারে।
পরবর্তী পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক দল জরিপ করা পরিবারের ৫ থেকে ১০ শতাংশ আবার যাচাই করবে।
এতে ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা মাঠকর্মীর ভুলের কারণে কোনো পরিবার ভুলভাবে সুবিধাভোগী হওয়া বা বাদ পড়ার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে।
তবে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোটি কোটি পরিবারের এত বিপুল তথ্য একটি অভিন্ন ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হলে সেই তথ্য কে দেখতে পারবে, কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী হবে—এসব বিষয়েও স্পষ্ট ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
কে সুবিধা পাবেন, সিদ্ধান্ত হবে আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে
পরিবার কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে পরিবারের আয় ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে একটি পরোক্ষ আর্থিক সক্ষমতা যাচাই পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
এই পদ্ধতির ভিত্তি হবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য।
পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে পাঁচটি আয়ের স্তরে ভাগ করা হবে। এর মধ্যে নিচের তিনটি স্তরের পরিবারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু পরিবারের ঘোষিত আয় নয়, পরিবারের সদস্যদের চাকরি, সম্পদ, সঞ্চয় ও জমির তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
কোনো পরিবারের একজন সদস্যও যদি নিয়মিত সরকারি পেনশন পান, সরকারি বা রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত চাকরি করেন অথবা আয়কর দেন, তাহলে সেই পরিবার পরিবার কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
একইভাবে কোনো সদস্যের নামে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র, নিবন্ধিত চার চাকার গাড়ি অথবা অর্ধ একরের বেশি আবাদি বা বাণিজ্যিক জমি থাকলেও ওই পরিবার সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবে না।
এই শর্তগুলো ব্যবহার করে তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারকে বাদ দিয়ে সরকারি অর্থ অধিক দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একই পরিবারের একাধিক সুবিধা নেওয়া ঠেকানোর চেষ্টা
বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হচ্ছে সুবিধাভোগীদের তথ্য বিভিন্ন দপ্তরে আলাদাভাবে থাকা।
একজন ব্যক্তি একটি কর্মসূচিতে ভাতা পাওয়ার পাশাপাশি অন্য কর্মসূচিতেও নাম তুলেছেন কি না, অনেক ক্ষেত্রে তা দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন।
এই সমস্যা কমাতে পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য একসঙ্গে যুক্ত করে একটি অভিন্ন পারিবারিক পরিচিতি তৈরির কাজ করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।
এর ফলে একই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় আলাদা পরিচয়ে সরকারি সুবিধার জন্য আবেদন করলে তা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সরকারি তথ্যভান্ডারগুলোর তথ্য কতটা হালনাগাদ এবং নির্ভুল তার ওপর। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের তথ্যে ভুল থাকলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারও সাময়িকভাবে সমস্যায় পড়তে পারে। তাই তথ্য সংশোধনের সহজ ব্যবস্থা রাখা জরুরি হবে।
৩,০৭২ ব্যাংক শাখা থেকে অর্থ তোলার সুযোগ
পরিবার কার্ডের অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রেও নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সুবিধাভোগীদের দেওয়া হবে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য চিপযুক্ত পরিবার কার্ড, যা দেশের জাতীয় খুচরা অর্থ পরিশোধ অবকাঠামো টাকাপে-এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এর মাধ্যমে সুবিধাভোগীরা বাণিজ্যিক ব্যাংকের যন্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় নগদ উত্তোলন যন্ত্র ব্যবহার করে অর্থ তুলতে পারবেন।
প্রাথমিকভাবে অর্থ বিতরণের জন্য ৩,০৭২টি নির্ধারিত ব্যাংক শাখা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব শাখা থাকবে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অধীনে—সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক।
নারীর নামে অর্থ বরাদ্দ করার পাশাপাশি যদি ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করা যায়, তাহলে প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে গ্রাম ও দুর্গম চরাঞ্চলে ব্যাংক শাখা বা নগদ উত্তোলন যন্ত্রে যাতায়াতের খরচ এবং দূরত্বও বিবেচনায় রাখতে হবে। মাসে ২,৫০০ টাকা তুলতে যদি একজন সুবিধাভোগীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, তাহলে সহায়তার একটি অংশ যাতায়াতেই ব্যয় হয়ে যেতে পারে।
মার্চের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে কী পাওয়া গেছে
দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরুর আগে মার্চে নির্বাচিত কিছু এলাকায় পরিবার কার্ডের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালু করা হয়েছিল।
ওই পর্যায়ে মোট ১,০৯,৬৭৯টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
তথ্য যাচাইয়ের পর প্রায় ৭৭ হাজার পরিবারকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে আরও বিস্তারিত যাচাই করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী কিংবা অন্য অযোগ্যতার শর্ত পূরণকারী সদস্য রয়েছে।
ফলে প্রায় ৬ হাজার পরিবারকে পরবর্তী পর্যায়ে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে নির্বাচিত পরিবারের প্রায় ৯২ শতাংশ পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় সফলভাবে আনা সম্ভব হয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—প্রথমবার তথ্য সংগ্রহ করলেই চূড়ান্ত সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা যাবে না। তথ্য একাধিক স্তরে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ ভুলভাবে একজন সচ্ছল ব্যক্তি তালিকায় ঢুকে পড়লে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় হয় না; একই সঙ্গে একজন প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের সুযোগও কমে যেতে পারে।
শুধু পরিসংখ্যান ব্যুরো নয়, প্রশাসনের বড় অংশ যুক্ত
পরিবার কার্ডের জরিপ প্রচলিত জাতীয় শুমারির তুলনায় প্রশাসনিকভাবে ভিন্ন পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
সাধারণত বড় ধরনের জাতীয় শুমারি ও জরিপে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রধান ভূমিকা পালন করলেও পরিবার কার্ডের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তাদেরও সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।
বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভাগ, জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের বহুস্তরীয় প্রশাসনিক তদারকি তথ্যের মান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় প্রভাব যেন সুবিধাভোগী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২,৪০০ কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হবে
পরিবার কার্ড নিয়ে আলোচনায় ২,৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। তবে এই অর্থ সরাসরি পরিবারগুলোর মাসিক ভাতা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে না।
অর্থটি মূলত দেশব্যাপী জরিপ, তথ্য সংগ্রহ, তথ্যভান্ডার তৈরি, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, মাঠপর্যায়ের লোকবল এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে।
এর ৯০০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের সামাজিক সুরক্ষা, অন্তর্ভুক্তি, সহনশীলতা, উদ্ভাবন ও রূপান্তর কর্মসূচি থেকে আসবে। বাকি ১,৫০০ কোটি টাকা সরকার নিজস্ব অর্থায়নে দেবে।
এত বড় অঙ্কের প্রশাসনিক ও জরিপ ব্যয়ের যৌক্তিকতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নতুন তথ্যভান্ডার ভবিষ্যতে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় তার ওপর।
যদি একবার তৈরি হওয়া পরিবারভিত্তিক তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বারবার আলাদা তালিকা তৈরির প্রয়োজন কমতে পারে।
অন্যদিকে তথ্য দ্রুত পুরোনো হয়ে গেলে কিংবা বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নিজেদের আলাদা তালিকাই ব্যবহার করতে থাকলে এত বড় বিনিয়োগের সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে।
পরিবারের জন্য মাসে ২,৫০০ টাকা কতটা কার্যকর
গলাচিপার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, মাসিক ২,৫০০ টাকা দরিদ্র পরিবারের জন্য অন্তত কিছু নিয়মিত আর্থিক নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় ২,৫০০ টাকা বড় অঙ্ক নয়। একটি পরিবারের মাসিক খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের সব খরচ এ অর্থ দিয়ে বহন করা সম্ভব নয়।
তবে পরিবার কার্ডকে যদি পূর্ণ আয়-প্রতিস্থাপন কর্মসূচির বদলে ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর গুরুত্ব ভিন্ন।
দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, জেলে কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় কম আয় নয়, বরং আয়ের অনিশ্চয়তা। কোনো মাসে কাজ থাকলেও পরের মাসে তা নাও থাকতে পারে।
সেই জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে একটি নিশ্চিত অর্থ পাওয়া খাদ্য কেনা, ওষুধ নেওয়া বা সন্তানের স্কুলের খরচ মেটাতে সহায়তা করতে পারে।
তানজিলার পরিবারের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা সঞ্চয় করার সিদ্ধান্ত আরও একটি দিক তুলে ধরে। নিয়মিত নগদ সহায়তা শুধু তাৎক্ষণিক ব্যয় নয়, ক্ষুদ্র সঞ্চয় তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সঠিক মানুষ নির্বাচন
পরিবার কার্ডের প্রযুক্তি, তথ্যভান্ডার কিংবা নতুন কার্ড যত আধুনিকই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কর্মসূচির সাফল্যের মূল মাপকাঠি হবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার সহায়তা পাচ্ছে কি না।
পরোক্ষ আর্থিক সক্ষমতা যাচাই পদ্ধতি সাধারণত পরিবারের বাড়ির ধরন, সম্পদ, জমি, পেশা, আয় এবং জীবনযাত্রার বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে একটি আর্থিক অবস্থান নির্ধারণ করে।
কিন্তু মানুষের বাস্তব জীবন সবসময় একটি নির্দিষ্ট হিসাবের মধ্যে ধরা যায় না।
কোনো পরিবারের পুরোনো একটি পাকা ঘর থাকতে পারে, অথচ বর্তমানে তাদের নিয়মিত আয় নেই। আবার কারও নামে সামান্য জমি থাকতে পারে, কিন্তু সেই জমি থেকে কার্যকর আয় নাও হতে পারে।
তাই শুধু স্বয়ংক্রিয় হিসাবের ওপর নির্ভর না করে অভিযোগ, পুনর্বিবেচনা এবং তথ্য সংশোধনের সুযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যের নিরাপত্তাও বড় প্রশ্ন
৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ মানে দেশের বিপুল সংখ্যক নাগরিকের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আর্থিক তথ্য একটি ব্যবস্থার মধ্যে আসবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক, আর্থিক অবস্থা, জমি, চাকরি, ছবি এবং বসবাসের অবস্থানের মতো তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তাই পরিবার কার্ড কর্মসূচি সফল করতে শুধু সুবিধাভোগী নির্বাচন নয়, তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কোন কর্মকর্তা কোন তথ্য দেখতে পারবেন, কতদিন তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, অন্য কোনো কাজে এই তথ্য ব্যবহার করা যাবে কি না এবং কোনো তথ্য ফাঁস হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
কারণ সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংগৃহীত তথ্য নাগরিকের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করুক, সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের সামাজিক সহায়তার কাঠামো
পরিবার কার্ডের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সম্ভবত মাসে কত টাকা দেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্য সহায়তা এবং বিভিন্ন শ্রেণির জন্য আলাদা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচির তালিকা ও প্রশাসনিক কাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে আলাদা।
একটি নির্ভুল পরিবারভিত্তিক জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে সরকার একটি পরিবারের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সহায়তা নির্ধারণ করতে পারবে।
এর ফলে একই পরিবার অপ্রয়োজনীয়ভাবে একাধিক সুবিধা নেওয়া এবং অন্য দরিদ্র পরিবার সব সুবিধা থেকে বাদ পড়ার মতো বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। একটি পরিবার আজ দরিদ্র হলেও কয়েক বছর পর তাদের অবস্থা উন্নত হতে পারে। আবার বর্তমানে সচ্ছল কোনো পরিবার দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা চাকরি হারানোর কারণে দ্রুত আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।
অর্থাৎ পরিবার কার্ডকে একবারের জরিপের ফল হিসেবে না দেখে পরিবর্তনশীল একটি সামাজিক তথ্যব্যবস্থা হিসেবে পরিচালনা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
গলাচিপা থেকে দেশজুড়ে বড় পরীক্ষা
গলাচিপার তানজিলা বেগমের পরিবারের জন্য মাসে ২,৫০০ টাকা হয়তো জাতীয় অর্থনীতির হিসাবে খুব ছোট একটি সংখ্যা। কিন্তু অনিয়মিত আয়ের একটি পরিবারের কাছে এই অর্থের মূল্য অনেক বেশি।
একদিকে এই টাকা দিয়ে প্রতিদিনের খাবার ও সন্তানের প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে, অন্যদিকে ৫০০ টাকা করে ভবিষ্যতের দুর্যোগের জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে। উপকূলীয় একটি পরিবারের জন্য এই ছোট সঞ্চয়ই কখনো কয়েক দিনের খাদ্যের নিশ্চয়তা হয়ে উঠতে পারে।
এখন সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, একটি ছোট পরীক্ষামূলক এলাকার অভিজ্ঞতা কি ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের জরিপ এবং শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার বিশাল ব্যবস্থায় সফলভাবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে?
পরিকল্পনার পরিসর নিঃসন্দেহে বড়। ৬৬,৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী, ৬,৬৮১ জন তত্ত্বাবধায়ক, ৩,০৭২টি ব্যাংক শাখা এবং ২,৪০০ কোটি টাকার জরিপ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি দেখাচ্ছে, সরকার কর্মসূচিটিকে বড় পরিসরেই বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
তবে সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তিনটি বিষয়—সঠিক পরিবার নির্বাচন, স্বচ্ছ অর্থ বিতরণ এবং নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তা।
এই তিন ক্ষেত্রে সফলতা এলে পরিবার কার্ড বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত, স্বচ্ছ ও প্রয়োজনভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আর যদি তথ্য ভুল হয়, স্থানীয় প্রভাব প্রবেশ করে কিংবা প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়ে, তাহলে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
তাই ১৬ আগস্ট ২০২৬ কিশোরগঞ্জ থেকে পরিবার কার্ডের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুধু নতুন একটি সরকারি কর্মসূচির উদ্বোধন নয়। এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর একটি বড় পরীক্ষার শুরু হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ধারণ করবে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর—রাষ্ট্রের সহায়তা কি সত্যিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন পরিবারের কাছে নিয়মিত, স্বচ্ছ এবং সম্মানজনকভাবে পৌঁছাতে পারছে?

