নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক স্কুলছাত্রীকে প্রকাশ্যে পেছন থেকে লাথি মারার ঘটনার পর যে সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে, তা শুধু একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়—এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং রাষ্ট্রের আইনের শাসন নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঘটনার শিকার কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলড্রেস পরা ওই ছাত্রী ও তার এক সহপাঠী শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটার সময় এক কিশোর পেছন থেকে তাকে লাথি মারে। ছাত্রীটি প্রতিবাদ করার পরও তাকে আবার লাথি মারা হয়। ঘটনাটি প্রায় এক মাস আগের হলেও ভিডিওটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ঘটনার শিকার সেই স্কুলছাত্রীকেই বিদ্যালয় থেকে টিসি দিয়ে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল মতিন প্রধানের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়া এবং উচ্ছৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা বসে ছাত্রীর পরিবারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো—একজন ছাত্রী লাথি খেল, আর বিদ্যালয়ের ‘সুনাম ক্ষুণ্ন’ হওয়ার দায়ও কি সেই ছাত্রীর?
যে শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া, মানসিকভাবে পাশে দাঁড়ানো এবং তার শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করা কি বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়?
যদি স্কুল চলাকালে বিদ্যালয়ের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই নিয়মভঙ্গ হয়ে থাকে, সেটি অবশ্যই আলাদা প্রশাসনিক বিষয়। কিন্তু সেই নিয়মভঙ্গের শাস্তি কি এমন হতে পারে, যার ফলে একটি শিশু তার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়? বিশেষ করে যখন সে একই সময়ে শারীরিক নিগ্রহের শিকার?
এখানেই সবচেয়ে বড় নৈতিক প্রশ্নটি সামনে আসে।
একটি শিশুকে লাথি মারা হলো—তারপর সেই শিশুকেই কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষা কি ভুক্তভোগীকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সম্ভব? বরং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুনাম তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সেখানে অন্যায় হলে প্রতিষ্ঠান ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ায় এবং অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
ঘটনার পর অভিযুক্ত কিশোরকে স্থানীয়ভাবে কান ধরে ওঠবস করিয়ে ক্ষমা চাওয়ানোর একটি ভিডিওও ছড়িয়ে পড়ে। পরে জেলা সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন কর্মকর্তার মাধ্যমে তাকে তার মা-বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়েছে এবং ছয় মাস কাউন্সেলিং ও প্রবেশন তত্ত্বাবধানে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযুক্ত কিশোরের বয়স প্রায় ১১ বছর হওয়ায় শিশু আইনের কাঠামোর মধ্যে তার জন্য সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে বোধগম্য। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন—শিশু অপরাধীর সংশোধনের সুযোগ থাকলে, নির্যাতনের শিকার শিশুটির জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কোথায়?
একজন শিশুকে অপরাধ থেকে ফেরানোর দায়িত্ব যেমন সমাজ ও রাষ্ট্রের, তেমনি একজন নির্যাতিত শিশুকে ভয়, অপমান ও শিক্ষাবঞ্চনা থেকে রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি তাই শুধু লাথি মারা নয়; বরং লাথি খাওয়ার পরও যদি একজন শিশুকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়—‘তোমারই দোষ’, তাহলে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী শিক্ষা দিচ্ছি?
আমরা কি তাকে বলছি—অন্যায় সহ্য করো, প্রতিবাদ করো না; কারণ প্রতিবাদ করলে শেষ পর্যন্ত তোমাকেই শাস্তি পেতে হতে পারে?
এ ঘটনা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনেরও জবাব দেওয়া প্রয়োজন। কোন বিধির অধীনে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কোন যুক্তিতে একজন নির্যাতিত চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে টিসি দেওয়া হলো—তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা উচিত।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের উচিত ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং টিসির সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা। কারণ একটি শিশুর শিক্ষাজীবন কোনো স্থানীয় সালিস, সামাজিক চাপ কিংবা তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বলি হতে পারে না।
সমাজের কাছেও প্রশ্ন আছে।
কেন একটি মেয়েকে লাথি মারার ঘটনা দেখে আমরা প্রথমে প্রশ্ন করি—‘মেয়েটি সেখানে কেন ছিল?’ অথচ প্রশ্ন করি না—‘একজন কিশোর কেন তাকে লাথি মারল?’
এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
আর রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন আরও বড়—একটি শিশু যদি প্রকাশ্যে শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়, তাহলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? তার শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? তার মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব কার?
আইনের শাসনের অর্থ কেবল অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়; ভুক্তভোগী যেন অপরাধের কারণে দ্বিতীয়বার শাস্তি না পায়—সেটিও আইনের শাসনের মৌলিক পরীক্ষা।
সোনারগাঁয়ের এই ঘটনা তাই শুধু একটি স্কুলছাত্রীর ঘটনা নয়। এটি আমাদের সমাজের আয়না।
আজ একজন স্কুলছাত্রী লাথি খেয়ে টিসি পেল। আগামীকাল আরেকটি শিশু যদি নিপীড়নের শিকার হয়ে মনে করে—‘বিচার চাইলে আমাকেই হয়তো স্কুল ছাড়তে হবে’, তাহলে দায় কার?
আর কতকাল ভুক্তভোগীকেই অপরাধীর আসনে বসানো হবে?
আর কতকাল মেয়েদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শিক্ষার অধিকার সামাজিক ভুল সিদ্ধান্তের কাছে পরাজিত হবে?
সোনারগাঁয়ের এই ছোট্ট মেয়েটির ঘটনা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেছে—
আমরা কি সত্যিই আইনের শাসনের সমাজ গড়তে চাই, নাকি শুধু অপরাধের ভিডিও ভাইরাল হলে কয়েক দিন ক্ষোভ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করতে চাই?

