যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতালির রোমে প্রায় ৪০ ঘণ্টা চরম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানোর পর অবশেষে ঢাকায় ফিরেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের যাত্রীরা।
রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বিজি৩০৬ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
শনিবার রাতে ইতালি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুসহ যাত্রীদের বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই দীর্ঘ সময় কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়েছে। এর আগে এসি বন্ধ অবস্থায় প্রায় ৮ ঘণ্টা তাদের উড়োজাহাজের ভেতর আটকে থাকতে হয়। পরে ইমিগ্রেশন জটিলতার কারণে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীরা হোটেলেও যেতে পারেননি।
রোববার ঢাকায় ফেরার পর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওই ফ্লাইটের যাত্রীরা রোম বিমানবন্দরের লাউঞ্জে তাদের দুর্বিষহ সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের সুযোগ না পাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সংগ্রহেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন অনেক যাত্রী ও তাদের স্বজন।
যাত্রীরা জানান, প্রথম দিন এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বন্ধ থাকা অবস্থায় তাদের প্রায় ৮ ঘণ্টা উড়োজাহাজের ভেতরে বসিয়ে রাখা হয়। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পরে তাদের টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হলেও অন্তত ১৭৪ জন যাত্রী হোটেলে থাকার সুযোগ পাননি। বাধ্য হয়ে তাদের বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে রাত কাটাতে হয়।
যাত্রী শাহজাহান আলম জানান, তারা প্রায় ৪০ ঘণ্টা ‘যাযাবরের মতো’ কাটিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘উড়োজাহাজের ভেতরেই আট ঘণ্টা বসেছিলাম। পরে আমাদের লাউঞ্জে নেওয়া হয় এবং বলা হয় যে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু যেসব যাত্রীর কাছে মার্কিন ও কানাডিয়ান পাসপোর্ট ছিল, শুধু তাদেরই হোটেলে নেওয়া হয়। আর আমাদের যাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট তাদের লাউঞ্জেই রাখা হয়।’
আনিকা নামের আরেক যাত্রী জানান, উড়োজাহাজের ভেতরে প্রায় তিন ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর তারা কারিগরি ত্রুটির কথা জানতে পারেন। এরপর আরও প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর তাদের উড়োজাহাজ থেকে নামানো হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রায় ৪০ ঘণ্টা চেয়ারে বসেই কাটাতে হয়েছে।’
তার মতে, ইতালিতে যাত্রীদের সাময়িকভাবে বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং বাংলাদেশ দূতাবাস আরও চেষ্টা করতে পারত। দীর্ঘ এই ভোগান্তির জন্য তিনি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলাকে দায়ী করেন।
আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা। তিনি বিমানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে বলেন, ‘একজন মানুষ কত ঘণ্টা এভাবে চেয়ারে বসে থাকতে পারে? আমরা যে এতটা কষ্ট পেলাম, অথচ কারও কোনো জবাবদিহি নেই।’
মাহমুদা তালুকদার নামের আরেক যাত্রী জানান, কানাডিয়ান পাসপোর্ট থাকার কারণে তিনি তার ছোট মেয়েকে নিয়ে হোটেলে থাকতে পেরেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘কানাডিয়ান পাসপোর্ট থাকায় মেয়েকে নিয়ে আমাকে বেশি কষ্ট পেতে হয়নি। কিন্তু যাদের বিমানবন্দরেই থাকতে হয়েছিল, তাদের অমানুষিক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।’
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী আমিনা আঞ্জুম তন্বীর বাবা-মা ওই উড়োজাহাজে ছিলেন। তিনি জানান, তার বাবার তিনবার বাইপাস সার্জারি হয়েছে। দীর্ঘ সময় দুর্ভোগের মধ্যে তাকে একটুও ঘুমাতে পারেননি।
তিনি আরও জানান, শিশুদের নিয়ে ভ্রমণরত কিছু পরিবার ডায়াপার ও শিশুখাদ্যের সংকটেও পড়েছিল।
ওই ফ্লাইটে থাকা এক যাত্রীর ছেলে মো. ওহিদুল হক শনিবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে লেখেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় বয়স্ক যাত্রী, নারী ও শিশুরা তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন।
ওই ফ্লাইটের যাত্রী সৈয়দ মাহমুদ হাসান ফেসবুকে লেখেন, শিশু, প্রবীণ ও পরিবারসহ প্রায় ১৭০ বাংলাদেশি নাগরিককে বিমানবন্দরের ভেতরেই থাকতে হয়েছিল। অন্যদিকে বিদেশি পাসপোর্টধারীদের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
টরন্টো থেকে স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি ২৫৯ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।
প্রায় ৮ ঘণ্টা ওড়ার পর কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে উড়োজাহাজটি রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
বিমান বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই উড়োজাহাজে থাকা প্রকৌশলী এবং রোমে বিমানের চুক্তিভিত্তিক প্রকৌশলী দল প্রথমে ত্রুটি সমাধানের চেষ্টা করেন।
কয়েক দফা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শনিবার ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং দুই সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল রোমে পাঠায় বিমান।
প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ শেষ করার পর রাতেই উড়োজাহাজটিকে ওড়ার উপযোগী ঘোষণা করা হয়। শনিবার ইতালির স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে ফ্লাইটটি রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।
রোমে নিয়োজিত বিমানের এক কর্মকর্তা জানান, বিমান কর্তৃপক্ষ সব যাত্রীর জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় ভিসা না থাকায় ইতালির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ অন্তত ১৭০ যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, শুধু কানাডিয়ান বা মার্কিন পাসপোর্টধারী যাত্রীরাই ইমিগ্রেশন পার হয়ে হোটেলে যেতে পেরেছিলেন।
এদিকে বিমানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা যাত্রীদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার করেনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সংস্থাটি শুধু জানিয়েছে, ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশসহ প্রকৌশলীরা গিয়ে উড়োজাহাজটি মেরামত করেন এবং সেটিকে চলাচলের উপযোগী করে তোলেন।
বিমান বলছে, জ্বালানি নেওয়ার জন্য নির্ধারিত যাত্রাবিরতির সময়ই সমস্যার সূত্রপাত হয়।
শনিবার শেষ রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর যাত্রীদের প্রায় ৪০ ঘণ্টার দুর্ভোগের অবসান ঘটে।

