বাড়ির প্রধান ফটক খোলা থাকলেও সেটি দিয়ে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই—সামনেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দশ-বারো ফুট উঁচু একটি ইটের দেয়াল। বাইরের জগতে পৌঁছানোর একমাত্র রাস্তা এখন প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ, আর সেই ছাদে ওঠার একমাত্র অবলম্বন একটি কাঠের মই। সাভারের এক প্রবীণ দম্পতির দৈনন্দিন জীবনের এই চিত্র গত আট বছর ধরে একইরকম রয়ে গেছে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ আনিসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী রাশিদা বেগমকে প্রতিদিনই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাতায়াত করতে হচ্ছে—কখনো বাজারের জন্য, কখনো চিকিৎসকের কাছে যেতে, আবার কখনো নিতান্ত প্রয়োজনীয় কোনো কাজে। প্রতিবারই তাঁদের পাড়ি দিতে হয় এই বিপজ্জনক পথ। ঘটনাটি ঘটেছে সাভার উপজেলার তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার একটি গ্রামে, যেখানে ষাটোর্ধ্ব এই দম্পতি নিজেদের বাড়িতে থেকেও এক ধরনের বন্দিদশায় দিন কাটাচ্ছেন।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালে ঝালকাঠি থেকে এসে সাভারের এই এলাকায় চার শতাংশ জমি কিনে বসতবাড়ি গড়ে তোলেন আনিসুর রহমান। সে সময় বাড়ির পাশ দিয়ে যাতায়াতের একটি রাস্তা ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁর বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দেয়াল তুলে যাতায়াতের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেন।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, এই দম্পতির বাড়ির সামনে সত্যিই উঁচু একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, যার ওপাশে যাওয়ার কোনো স্বাভাবিক পথ নেই। পাশের একটি বাড়ির ছাদে ওঠার জন্য রাখা হয়েছে একটি কাঠের মই। সেই মই বেয়ে ছাদে উঠে, তারপর অন্যপাশ দিয়ে নেমেই তবে মূল সড়কে পৌঁছাতে হয় তাঁদের। যে বয়সে সমতল রাস্তায় হাঁটাচলাই কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে, সেই বয়সে প্রতিদিন মই বেয়ে ওঠানামা করাটা যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আনিসুর রহমান জানান, ১৯৯৫ সালে জমি কিনে বাড়ি করার সময় পাশে রাস্তা থাকলেও পরবর্তীতে স্থানীয় ওই ব্যক্তি তাঁর জমি কিনে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজি হননি। এরপরই বাড়ির প্রবেশপথে দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে তাঁর অভিযোগ। প্রায় আট বছর ধরে তাই মই দিয়ে অন্যের বাড়ির ছাদ পার হয়েই বাইরে যেতে হচ্ছে তাঁদের।
এই বৃদ্ধ দম্পতির কাছে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো হঠাৎ অসুস্থতা। কারণ জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা তাঁদের নেই—অ্যাম্বুলেন্স দূরের কথা, স্বাভাবিক পথেই একজন মানুষকে বের করে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাশিদা বেগম জানান, বাড়িতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ দিয়েই হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনও পুরোপুরি স্বাভাবিক ধারায় চলে না। বাজার করা, ওষুধ কেনা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া—প্রতিটি কাজের আগেই তাঁদের ভাবতে হয় কীভাবে বাড়ি থেকে বের হবেন এবং কীভাবেই বা আবার ফিরে আসবেন।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর বাড়ির একজন ব্যবস্থাপক জানান, একজনের কাছ থেকে চার শতাংশ জমি কেনা হয়েছিল, আর পরবর্তীতে আনিসুর রহমান জরিপ নথিতে জমির পাশ দিয়ে একটি রাস্তা অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এই নথি বাতিলের জন্য আদালতে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় সংসদ সদস্য বিষয়টি নিয়ে বলেন, তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং ভুক্তভোগী পরিবার যোগাযোগ করলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করবেন। অন্যদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসক জানান, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর কেউ অবৈধভাবে জায়গা দখল করে থাকলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আট বছর ধরে একটিমাত্র মইয়ের ওপর নির্ভর করেই চলছে এই বৃদ্ধ দম্পতির যাতায়াত। নিজেদের কেনা জমিতে, নিজেদের ঘরে বসবাস করেও বাইরের জগতে যাওয়ার স্বাধীনতা নেই তাঁদের। বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়া দুজন মানুষের এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিদিনের সংগ্রাম শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের গল্প নয়, বরং এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে—নিজের বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য একজন প্রবীণ মানুষকে আর কত দিন অন্যের ছাদ আর একটি মইয়ের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে।

