জলবায়ু পরিবর্তন বা এল নিনোর মতো জটিল বৈজ্ঞানিক পরিভাষা হয়তো জানেন না রাজধানীর মণিপুরিপাড়ার এক প্রৌঢ় রিকশাচালক। কিন্তু প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা দিয়েই তিনি বুঝতে পারেন, গরম আগের চেয়ে অনেক বেশি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গত জুন মাসে রিকশা চালানোর সময় হঠাৎ মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বর্তমানে এমন ঘটনা তাঁর মতো আরও অনেক শ্রমিকের সঙ্গেই ঘটছে, কারণ গরমের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে।
কাজ শেষে বাসাতেও তেমন কোনো স্বস্তি মেলে না তাঁর। একটি ছোট্ট ঘরে আরও কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতে হয় তাঁকে, আর দিনের গরমে তেতে ওঠা সেই ঘর রাতেও সহজে ঠান্ডা হতে চায় না।
এই রিকশাচালকের অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র গরমে খোলা জায়গায় কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে প্রায় ২৪ কর্মদিবস এবং বদ্ধ পরিবেশে কাজ করা শ্রমিকেরা প্রায় সাড়ে ১৩ কর্মদিবস হারান। এই কর্মদিবস ক্ষতি এবং চিকিৎসাজনিত ব্যয় মিলিয়ে দেশে বছরে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থা যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। আগামীকাল বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণাটি প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গবেষণার জন্য ঢাকার প্রায় পৌনে দুইশ অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণ, সড়কের কাজ ও রিকশা চালানোর মতো খোলা পরিবেশে কর্মরত পরিবার ছিল সিংহভাগ, বাকিরা পোশাক কারখানার মতো বদ্ধ পরিবেশে কর্মরত। জরিপের পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের সময় সরাসরি পর্যবেক্ষণ, দলীয় আলোচনা, সাক্ষাৎকার ও পারিবারিক কেস স্টাডিও পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া তিনজন চিকিৎসকের একটি প্যানেল স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে এবং জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ ও আঞ্চলিক তাপমাত্রার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ের ক্ষতির প্রাক্কলন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে শ্রমিকের আয় সরাসরি নির্ভর করে তাঁর উপস্থিতি ও কর্মক্ষমতার ওপর। ফলে গরমের কারণে কাজ বন্ধ রাখা বা কাজের গতি কমে যাওয়া মানেই সরাসরি আয় হারানো। গবেষণায় অংশ নেওয়া একজন নির্মাণশ্রমিক জানান, কংক্রিটের গরমে কখনো কখনো তাঁর শ্বাস নিতেই কষ্ট হয়, মনে হয় যেন শরীরের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে।
হিসাব অনুযায়ী, খোলা পরিবেশে কর্মরত একজন শ্রমিক বছরে গড়ে প্রায় দেড়শ ডলার এবং বদ্ধ পরিবেশে কর্মরত শ্রমিক প্রায় নব্বই ডলার সমমূল্যের মজুরি হারান। ঢাকায় জীবনধারণযোগ্য মাসিক মজুরির তুলনায় খোলা পরিবেশে কাজ করা শ্রমিক পরিবারের আয় প্রায় ৪১ শতাংশ এবং বদ্ধ পরিবেশে কর্মরতদের আয় প্রায় ৩৪ শতাংশ কম। তাপজনিত আয়ক্ষতি যোগ করলে এই ঘাটতি আরও বেড়ে যথাক্রমে প্রায় ৪৬ ও ৩৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের একজন পরিচালক জানান, গরমে কাজের গতি কমে গেলে সেই ক্ষতি শ্রমিককেই একাকী বহন করতে হয়—তাঁরা আয় হারান, সঞ্চয় ভাঙেন কিংবা ঋণ নিতে বাধ্য হন, অথচ এই ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব রাখা হয় না, মেলে না কোনো ক্ষতিপূরণও।
সমস্যা কেবল কর্মস্থলেই সীমাবদ্ধ নয়। বদ্ধ পরিবেশে কর্মরত শ্রমিক পরিবারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং খোলা পরিবেশে কর্মরতদের প্রায় অর্ধেকের বেশি পরিবার টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের নিচে বসবাস করে। গাদাগাদি ঘর, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাব ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কাজ শেষে শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও ঘুম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ২৩ শতাংশ শ্রমিক কিডনিজনিত সমস্যার কথা জানিয়েছেন। গবেষকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দীর্ঘদিন তীব্র তাপের মধ্যে কাজ করলে মোট শ্রমিকের প্রায় ৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হিটস্ট্রোকের অভিজ্ঞতা হওয়া প্রতি বিশজনের প্রায় ঊনিশজনই কোনো চিকিৎসাই নেননি।
আশুলিয়ার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, গরমের সময় ডায়রিয়াজনিত রোগীর সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায়। তাঁর পঞ্চাশ শয্যার হাসপাতালে শুধু এই সমস্যা নিয়েই প্রতিদিন গড়ে প্রায় দশজন রোগী আসেন। স্বাস্থ্যবিধি না মানা কিংবা দূষিত খাবার-পানিও এর পেছনে কারণ হলেও অতিরিক্ত তাপের সঙ্গেও এর যোগসূত্র স্পষ্ট বলে তিনি মনে করেন।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণে দেশে বছরে প্রায় সোয়াশ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়। এতে শ্রমিকদের হারানো মজুরির পরিমাণ প্রায় সাড়ে চারশ কোটি ডলার, যা মোট জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক নয় শতাংশের সমান। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগজনিত কর্মক্ষমতা হ্রাসের প্রাক্কলিত ক্ষতি যোগ করলে এই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ছয়শ কোটি ডলারে, অর্থাৎ জিডিপির প্রায় সোয়া এক শতাংশ—বর্তমান বিনিময় হারে যা প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকার সমান।
এ প্রসঙ্গে একজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মন্তব্য করেন, গবেষণায় দেখানো সুনির্দিষ্ট অঙ্ক নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমজীবী গোষ্ঠী যে বড় সমস্যায় পড়েছে, সে বিষয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। তাঁর ভাষায়, তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি এখন একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে, আর গবেষণাটি সেই বাস্তবতা যথাযথভাবেই তুলে ধরেছে।
গত বছর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। রাজধানী ঢাকার তাপসূচক জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু গত বছরই তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যার কারণে দেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে।
বর্তমান শ্রম আইন ও বিধিমালায় কর্মক্ষেত্রে বাতাস চলাচল, পানীয় জল ও বিশ্রামের সাধারণ কিছু বিধান থাকলেও কাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিরাপদ তাপমাত্রার সীমা নেই। তাপমাত্রাভিত্তিক বাধ্যতামূলক বিরতিরও কোনো বিধান নেই, এবং তাপজনিত অসুস্থতাকে এখনো পেশাগত রোগ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, বর্তমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে শ্রম আইন সংশোধন করা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাপমাত্রা পরিমাপের প্রযুক্তিগত দিকটি স্পষ্ট করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিরতিতে বিশ্রামের বিধানও আইনে যুক্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। তাঁর ভাষায়, গবেষণাটি এই মৌলিক দিকটিকেই যথাযথভাবে সামনে এনেছে।
গবেষকেরা তাপমাত্রাভিত্তিক নগদ সহায়তা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যসহায়তা এবং কর্মস্থলে বিশুদ্ধ পানি, ইলেকট্রোলাইট, ছায়া ও বাধ্যতামূলক বিরতির ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করেছেন। তাঁদের প্রস্তাবিত এই সহায়তা প্যাকেজে বছরে আনুমানিক ৮৭৩ কোটি থেকে ১৬৫৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যা বর্তমান বার্ষিক ক্ষতির তুলনায় অনেকটাই কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো এই বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে এর মূল্য চোকাতে হবে আরও বড় আকারে, শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতি—উভয় দিক থেকেই।

