জেল সুপারের গায়ে থাকা ইউনিফর্মটির দিকে ইঙ্গিত করে একজন সিনিয়র জেল সুপার বললেন, শুধু কর্মকর্তাদের পোশাক নয়—সশ্রম কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত মোটা সাদাটে কাপড়ের সুতা তৈরি থেকে শুরু করে পুরো পোশাকটাই তৈরি করছেন বন্দীরা নিজ হাতে। শুধু তা-ই নয়, গোসল ও কাপড় ধোয়ার সাবানও তৈরি হচ্ছে তাঁদের হাতে, এমনকি রাতে ব্যবহৃত কম্বলও তাঁরাই পরিষ্কার করছেন অত্যাধুনিক মেশিনে।
গাজীপুরের একটি কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দীদের অনেকেই এভাবে দিনের বড় একটা সময় ব্যস্ত থাকছেন উৎপাদনমূলক কাজে। এতে একদিকে যেমন তাঁরা নতুন দক্ষতা অর্জন করছেন, তেমনি করছেন আয়ও। গাজীপুরের এই কারা কমপ্লেক্সে মোট চারটি কারাগার রয়েছে, যার একটি নারী বন্দীদের জন্য নির্ধারিত। কারা মহাপরিদর্শকের বিশেষ অনুমতিতে সম্প্রতি এই দুটি কারাগার সরেজমিনে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল।
নারী কারাগারের আঙিনায় দেখা গেল, মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসে গল্প করতে করতে নকশিকাঁথা সেলাই করছেন বন্দীরা। একজনের পাশে দেখা গেল তাঁর ব্যক্তিগত অর্থ-তহবিলের একটি কার্ড, যার মাধ্যমে তিনি মজুরির টাকায় ক্যানটিন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারেন, পরিবারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতে পারেন, এমনকি চাইলে টাকাও পাঠাতে পারেন পরিবারের কাছে। একজন নারী বন্দীর একটি কাঁথা সেলাই করতে সময় লাগে গড়ে প্রায় তিন সপ্তাহ।

সাজাপ্রাপ্ত নারী বন্দীদের জন্য প্রণীত একটি বিশেষ আইনে ব্লক-বাটিক, সূচিশিল্প, চুল কাটার প্রশিক্ষণ, বাঁশ-বেতের কাজ, দরজিবিজ্ঞান এবং কাপড়ের ফুল তৈরির মতো বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
কারাগারের একটি বিউটি পারলারে গিয়ে দেখা গেল, কেউ স্পা নিচ্ছেন, কেউবা চুল কাটাচ্ছেন। এখানে সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতা—উভয় পক্ষই বন্দী। যাঁরা রূপচর্চা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কারাগারে আসার আগে থেকেই এই পেশায় যুক্ত ছিলেন, এবং তাঁরাই অন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। পারলারে মোট পঁয়ত্রিশ ধরনের সেবার একটি মূল্যতালিকাও টাঙানো আছে দেয়ালে।
পাশের একটি কক্ষে কাউকে দেখা গেল কাপড় মাপছেন, কেউ কাটছেন কামিজ, কেউবা চালাচ্ছেন সেলাই মেশিন। এখানেও দেয়ালে ঝোলানো আছে মজুরির তালিকা—থ্রিপিস, ওয়ানপিস কিংবা সাধারণ ব্লাউজ তৈরির জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক উল্লেখ করা। তবে এই কারাগারে ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণ আপাতত বন্ধ আছে, আসন্ন একটি বাণিজ্য মেলার আগে তা আবার চালু হবে বলে জানা গেছে।
কারাগারের মূল ফটকের কাছেই রয়েছে একটি বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্র, যেখানে বন্দীদের তৈরি পণ্য বিক্রি হয়। এসব পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে বিশেষ একটি ব্র্যান্ড নামে, এবং একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও অনলাইনে এসব পণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে। পণ্য বিক্রির লভ্যাংশের অর্ধেক অংশ সরাসরি সংশ্লিষ্ট বন্দীদের দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বন্দীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে দেশের প্রায় সব কারাগারেই এমন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু আছে, যা মুক্তির পর সমাজে তাঁদের সম্মানজনক কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশের সত্তরের বেশি কারাগারে বন্দীদের তৈরি পণ্য বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বেশি। এই সময়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন প্রায় সোয়া আট লাখ বন্দী, এবং তাঁরা পারিশ্রমিক হিসেবে পেয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি।
দুই দশকেরও বেশি আগে যাত্রা শুরু হওয়া এই কারাগারে বন্দী পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ স্কুলটি চালু হয়েছে প্রায় এক দশক আগে। সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন কারাগারে মোট বন্দীর সংখ্যা ছিল প্রায় চার হাজার, যাঁদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছিলেন দেড় শতাধিক বন্দী।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সবাইকে এতে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, যা এই উদ্যোগের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশিক্ষণ স্কুলে ঢুকে দেখা গেল, সেখানে বন্দীদের নিঃশ্বাস ফেলারও যেন সময় নেই। আধুনিক আসবাবপত্র তৈরি, এমব্রয়ডারি ও মোজা বুনন, তৈরি পোশাক শাখা, প্রিন্টিং প্রেস, বই বাঁধাই, ইলেকট্রনিক ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, মোড়া ও ওয়েল্ডিং, তাঁত এবং দরজির কাজসহ বিভিন্ন ট্রেডে সমান তালে কাজ করছেন বন্দীরা। এমনকি পণ্য বহনের জন্য প্রয়োজনীয় রঙিন কাপড়ের ব্যাগও তৈরি হচ্ছে তাঁদেরই হাতে। বেতের আসবাবপত্র তৈরির কক্ষে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তায় প্রশিক্ষণ পরিচালনার তথ্যও দেয়ালে টাঙানো একটি ব্যানারে উল্লেখ আছে।
দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত সাবেক এক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, যিনি প্রায় এক দশক ধরে এই কারাগারে আছেন, জানান, কাজের মধ্যে থাকলে অলস বসে থাকতে হয় না, শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে, পাশাপাশি মজুরিও মেলে। তাঁর ভাষায়, মুক্তির পর এই প্রশিক্ষণের দক্ষতা পুনর্বাসনে সরাসরি কাজে লাগবে। জেল বিধিমালা অনুযায়ী শারীরিক শ্রমে যুক্ত থাকার সুবাদে সাজা মওকুফ বা রেয়াতের সুযোগও মিলছে বলে তিনি জানান।
কিছুদিন আগে উদ্বোধন হওয়া একটি ঝকঝকে সাবান কারখানায় অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরি হচ্ছে সাবান, যা গোলাপি মোড়কে প্যাকেট করছেন বন্দীরা মেঝেতে বসেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন শিফটে প্রায় ত্রিশজন বন্দী দৈনিক প্রায় ষোলো থেকে বিশ হাজার সাবান তৈরি করছেন।
সংশ্লিষ্ট জেলের একজন সিনিয়র জেল সুপার জানান, নিজস্ব কারাগারের চাহিদা মেটানোর পর অন্য কারাগারেও এই সাবান সরবরাহ করা হবে, পরে বাজারেও বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ প্রিন্ট করা রেজিস্ট্রার খাতাসহ অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যও অন্যান্য কারাগারে সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রায় এক দশক আগে চালু হওয়া কারাগারের বেকারিতে তৈরি হচ্ছে পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা খাবার। কম্বল ধোয়ার জন্য স্থাপিত একটি প্ল্যান্টে অত্যাধুনিক ওয়াশিং, ড্রাইং ও হাইড্রো মেশিনের মাধ্যমে চলছে ধোয়ার কাজ। এক বন্দী জানান, আগে হাতে ধুতে গিয়ে অনেক পরিশ্রম হতো, এখন মেশিনে বোতাম টিপলেই কাজ হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বন্দীদের জন্য এ ধরনের উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুধু তাঁদের সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বরং কারাগারকে ধীরে ধীরে একটি প্রকৃত সংশোধনকেন্দ্রে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা মুক্তির পর তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বাস্তব সহায়তা দিতে পারে।

