চার কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে মাগুরা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করতে এসেছিলেন ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা রুহুল আমিন পলাশ। গুরুতর অসুস্থ এই আসামিকে মঙ্গলবার স্ট্রেচারে করে আদালতকক্ষে তোলা হয়।
ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবিরের আদালতে রুহুল আমিন পলাশ আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিচারক আপাতত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. রমজান আলী (রিপন)।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারক বলেছেন, আসামি গুরুতর অসুস্থ এবং অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। তাঁর চিকিৎসা চলছে, সেটি চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি আবার আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারবেন।
কেন মামলাটি
২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফারমার্স ব্যাংক (পদ্মা ব্যাংক) লিমিটেডের জামালপুরের বকশীগঞ্জ শাখা থেকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে চার কোটি তিন লাখ ৪১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান।
মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়। তাঁরা হলেন পদ্মা ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী, তাঁর মেয়ে রিমি চিশতী, ব্যাংকের সাবেক সহকারী কর্মকর্তা ফখরুজ্জামান, সাবেক প্রশিক্ষণার্থী সহকারী কর্মকর্তা রুহুল আমিন পলাশ এবং কামরুজ্জামান।
তদন্ত শেষে এই পাঁচজনের সঙ্গে ব্যাংকের ওই শাখার প্রধান ও প্রথম সহসভাপতি মাসুদুর রহমান খানকেও অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের উপসহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান গত বছরের ৬ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
চারজনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা
গত ১৫ জানুয়ারি আদালত মামলার অভিযোগপত্র আমলে নেন। ওই সময় পলাতক থাকায় মাসুদুর রহমান, ফখরুজ্জামান, রুহুল আমিন পলাশ ও কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
মাহবুবুল হক চিশতী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং রিমি চিশতী জামিনে আছেন।
পরোয়ানা জারির পর মঙ্গলবার সকালে মাগুরা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসেন রুহুল আমিন পলাশ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাবা রেজাউল করিম ও স্ত্রী। আদালতে তাঁকে স্ট্রেচারে করে নেওয়া হয়।
‘কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত অবশ’
জামিনের শুনানিতে আইনজীবী মো. রমজান আলী দাবি করেন, রুহুল আমিন পলাশ কোনো অর্থ আত্মসাৎ বা জাল-জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে জুনিয়র কর্মকর্তারা অনেক সময় দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর মক্কেলও সে ধরনের নির্দেশ পালন করেছেন।
আসামিপক্ষের এই আইনজীবী আদালতকে জানান, রুহুল আমিন পলাশ স্নায়ুজনিত রোগে আক্রান্ত এবং পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ হয়ে যাওয়ায় তিনি দৈনন্দিন কাজও নিজে করতে পারেন না। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী।
আইনজীবী বলেন, এমন শারীরিক অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্স ও স্ট্রেচারে করে আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন তিনি। মানবিক ও শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জামিন দেওয়ার আবেদন করা হয়।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, আদালত বলেন, এ অবস্থায় আসামিকে কারাগারে পাঠানো হলে তাঁকে হাসপাতাল বা কারা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হবে। পরে আসামিপক্ষ আত্মসমর্পণের আবেদন প্রত্যাহার করে তাঁকে আরও কিছুদিন চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার আবেদন করে।
‘কয়েক বছর ধরে বিছানায়’
রুহুল আমিন পলাশের বাবা রেজাউল করিম বলেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তাঁর ছেলে অসুস্থ। কয়েক বছর ধরে তিনি বিছানায় পড়ে আছেন। অন্যের সাহায্য ছাড়া এমনকি শৌচাগারেও যেতে পারেন না। কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ব্যাংকসংক্রান্ত মামলায় ছেলেকে জড়ানো হয়েছে দাবি করে রেজাউল করিম বলেন, তাঁর ছেলে এ ঘটনায় জড়িত নন এবং তিনি ন্যায়বিচার চান।
আদালতের কার্যক্রম শেষে দুপুরের পর অ্যাম্বুলেন্সে করে আবার আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়েন রুহুল আমিন পলাশ।
মাগুরার মোহাম্মদপুর থানার দোহিল গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিমের ছেলে রুহুল আমিন পলাশ দুই সন্তানের বাবা।

