বাংলাদেশে সিগারেটের ওপর কর ও দাম গত দুই দশকে বারবার বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ধূমপান কমানোর লক্ষ্যটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জিত হয়নি। বরং কম দামের সিগারেটের দিকে ভোক্তাদের ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বাড়ায় কর বৃদ্ধির স্বাস্থ্যগত সুফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সরকার দীর্ঘদিন ধরে সিগারেটের দাম ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পেছনে দুটি প্রধান লক্ষ্য সামনে রেখেছে—একদিকে তামাকজাত পণ্য থেকে রাজস্ব বাড়ানো, অন্যদিকে মানুষের ধূমপানের প্রবণতা কমানো। বাস্তবে প্রথম লক্ষ্যটি অনেকটাই সফল হলেও দ্বিতীয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা যান। ফলে শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাব দিয়ে তামাক করনীতির সাফল্য বিচার করলে এর প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র পাওয়া যায় না।
তামাকের কারণে অর্থনীতির ক্ষতি কত?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট এবং হেলথবিষয়ক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণায় তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়, ২০২৪ সালে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা এবং উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৭৩ হাজার ৬৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এর মধ্যে তামাকজনিত অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর কারণে উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৪২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে আরও ৩০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা।
শুধু স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি নয়, তামাক উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে বন উজাড়, জমির অবক্ষয়, বর্জ্য ও পরিবেশদূষণের মতো ক্ষতিও রয়েছে। এসব যোগ করলে তামাকের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিগারেট থেকে সরকারের কর রাজস্ব ছিল ৪০ হাজার ৩১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ সিগারেট থেকে সরকারের যে পরিমাণ রাজস্ব আসে, তামাক ব্যবহারের কারণে দেশের অর্থনীতি ও সমাজের ওপর যে ব্যয় চাপছে, তা তার চেয়ে অনেক বেশি।
কর বাড়ল, কিন্তু সিগারেটের ব্যবহার কি কমেছে?
এখানেই বাংলাদেশের তামাক করনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সিগারেট থেকে সরকারের রাজস্ব ছিল ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই দশকেরও কম সময়ে সিগারেট থেকে কর আদায় বেড়েছে ১ হাজার শতাংশের বেশি।
কিন্তু একই সময়ে সিগারেট বিক্রির পরিমাণও কমেনি। বরং ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫০০ কোটি শলাকা সিগারেট বিক্রি হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ৮ হাজার ৪০০ কোটি শলাকায় পৌঁছায়। ১৯ বছরের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ বিক্রির পরিমাণ।
পরের অর্থবছরে বিক্রি কমে ৬ হাজার ৫০০ কোটি শলাকায় দাঁড়ায়। তবে এটিকে সরাসরি ধূমপায়ীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না রাজস্ব কর্মকর্তারা, তামাক কোম্পানি, বিশ্লেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো মানুষ তুলনামূলক কম দামের সিগারেটের দিকে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে করব্যবস্থার বাইরে থাকা অননুমোদিত সিগারেটের বাজারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দাম বাড়লে সস্তা সিগারেটের দিকে ঝুঁকছেন ধূমপায়ীরা
বাংলাদেশে বর্তমানে সিগারেটের জন্য চার স্তরের কর ও মূল্য কাঠামো রয়েছে। এগুলো হলো উচ্চমূল্যের, তুলনামূলক উচ্চমূল্যের, মাঝারি ও নিম্নমূল্যের সিগারেট।
সমস্যাটি হলো, কর বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক ধূমপায়ী বেশি দামের সিগারেট ছেড়ে কম দামের সিগারেট বেছে নিচ্ছেন। ফলে কর বৃদ্ধির কারণে যে পরিমাণে ধূমপান কমার কথা, বাস্তবে তা হচ্ছে না।
২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল উচ্চমূল্যের সিগারেটের দখলে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই অংশ নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮৫ শতাংশে।
অন্যদিকে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নিম্নমূল্যের সিগারেটের বাজার অংশ ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর আগের দশকের বড় একটি সময় এই সিগারেটের বাজার অংশ ৭০ শতাংশেরও বেশি ছিল।
অর্থনীতির ভাষায় ভোক্তাদের এই আচরণকে বলা হয় ‘ডাউনট্রেডিং’—অর্থাৎ দাম বা কর বাড়লে ক্রেতা একই পণ্য না ছেড়ে তুলনামূলক সস্তা বিকল্পের দিকে চলে যান।
ফলে কর বাড়ছে, রাজস্বও বাড়ছে; কিন্তু ধূমপায়ী হয়তো সিগারেট পুরোপুরি ছেড়ে দিচ্ছেন না। বরং আগের ব্র্যান্ডের পরিবর্তে কম দামের সিগারেট বেছে নিচ্ছেন।
সস্তা সিগারেট থাকলে করনীতির উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হবে?
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুকের মতে, বারবার কর বাড়ানোর পরও প্রত্যাশিত হারে ধূমপান কমেনি। কারণ সিগারেট এখনো অনেক মানুষের নাগালের মধ্যে রয়েছে এবং ভোক্তারা সহজেই কম দামের পণ্যে চলে যেতে পারেন।
তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক নীতি বিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুল আলমের মতে, একটি নিম্নমূল্যের সিগারেট প্রায় ৬ টাকায় কেনা যায়, যেখানে একটি ডিমের দাম প্রায় ১২ টাকা। তাঁর মতে, সিগারেটের দাম ও কর এমন পর্যায়ে বাড়েনি, যা মানুষকে ধূমপান ছাড়তে যথেষ্ট উৎসাহিত করবে।
এখানেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মূল উদ্বেগ। কারণ সস্তা সিগারেট বাজারে সহজলভ্য থাকলে শুধু কর বাড়িয়ে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কেউ ধূমপান শুরু করার ক্ষেত্রে কম দাম একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
চার স্তরের কর কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন
তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সিগারেটের বর্তমান চার স্তরের মূল্য কাঠামো কমিয়ে প্রথমে দুই স্তরে এবং পরবর্তী সময়ে এক স্তরে নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
তাদের যুক্তি হলো, বিভিন্ন দামের স্তর থাকলে কর বাড়ার পর ধূমপায়ীরা সহজেই এক স্তর থেকে অন্য স্তরের সস্তা সিগারেটে চলে যেতে পারেন। এতে কর বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
তারা উৎপাদনের মূল্যের ওপর নির্ভরশীল করের পাশাপাশি উৎপাদিত সিগারেটের পরিমাণের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট হারে কর আরোপেরও সুপারিশ করছেন।
বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
বাংলাদেশের সিগারেট বাজারে কয়েকটি বড় কোম্পানির আধিপত্য রয়েছে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল এবং আবুল খায়ের টোব্যাকো—এই তিন প্রতিষ্ঠান মিলে দেশের মোট সিগারেট সরবরাহের প্রায় ৯৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
এর মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের সিগারেটের পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যস্তরেও বড় উপস্থিতি ধরে রেখেছে।
কোম্পানিটির নিট মুনাফা ২০০৯ সালে ২৫০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা হয়েছে।
তবে বৈধ বাজারের বাইরেও দেশের সিগারেটের একটি বড় অনানুষ্ঠানিক বাজার রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০টি কোম্পানি করব্যবস্থার বাইরে থেকে বাজারের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে।
এই বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে শুধু করহার বাড়িয়ে পুরো তামাক বাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন।
স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের অর্থ কোথায় যাচ্ছে?
তামাকের ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশে ২০১৪ সালে ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অর্থের জোগান বাড়ানো।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি বছর এই সারচার্জ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি থেকে ৫৫০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। এর বড় অংশই এসেছে সিগারেট থেকে।
কিন্তু এই অর্থ আলাদা কোনো তহবিলে সংরক্ষিত হয় না। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণ, ধূমপানবিরোধী প্রচার কিংবা তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় ঠিক কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তা আলাদাভাবে নির্ণয় করা কঠিন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, যখন তামাকের কারণে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তখন তামাক থেকে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ কেন সরাসরি এই ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে না?
শুধু কর বাড়ালেই কি মানুষ ধূমপান ছাড়বে?
সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার মনে করেন, শুধু সিগারেটের দাম বাড়িয়ে দীর্ঘদিনের ধূমপায়ীদের আচরণে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন। তাঁর মতে, ধূমপান শুরু করার আগেই তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
এ জন্য শৈশব থেকেই তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বাস্তবতাও বলছে, দীর্ঘদিনের একজন ধূমপায়ী দাম বাড়লেও অনেক সময় সিগারেট কেনার জন্য নিজের অন্য খরচ কমিয়ে দেন। আবার কেউ বেশি দামের ব্র্যান্ড ছেড়ে কম দামের ব্র্যান্ডে চলে যান। ফলে মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপটি ধূমপান কমানোর দিকে যায় না।
তাই করনীতির সঙ্গে সচেতনতা, ধূমপান ছাড়তে সহায়তা, তরুণদের সুরক্ষা এবং বাজারে সস্তা ও অবৈধ সিগারেটের বিস্তার ঠেকানোর উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্বের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সিগারেট থেকে কত টাকা রাজস্ব আদায় হচ্ছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে তামাক করনীতির সাফল্য বিচার করা যাবে না।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে সিগারেট থেকে রাজস্ব এসেছে ৪০ হাজার ৩১ কোটি টাকা, সেখানে তামাক ব্যবহারের কারণে ২০২৪ সালে দেশের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।
এই ব্যবধানই দেখিয়ে দেয় সমস্যার গভীরতা।
সরকারের জন্য এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, সিগারেট থেকে কত বেশি রাজস্ব আদায় করা যাবে—শুধু তা নয়; বরং কীভাবে এমন একটি করব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যাতে সিগারেট মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থেই কম সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে দরকার করব্যবস্থার ফাঁক বন্ধ করা, অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ, সস্তা সিগারেটের বিস্তার ঠেকানো এবং তরুণদের ধূমপান থেকে দূরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ।
কারণ শেষ পর্যন্ত সিগারেটের কর থেকে পাওয়া রাজস্ব সরকারের আয় বাড়ালেও, তামাকজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হারানো, অকালমৃত্যু এবং পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় পুরো সমাজকেই। তাই তামাক করনীতির আসল সাফল্য রাজস্বের অঙ্কে নয়, কত মানুষ ধূমপান ছেড়েছেন এবং কত মানুষকে ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখা গেছে—সেখানেই।

