বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করার তাগিদ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক বন্ধন আরও মজবুত করার এবং নতুন বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করার প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুটি পৃথক বৈঠকে এই আহ্বান উঠে আসে।
প্রথম বৈঠকটি হয় সচিবালয়ে, যেখানে বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের নির্বাহী কমিটির সদস্যরা সাক্ষাৎ করেন প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সঙ্গে। একই দিনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আরেকটি বৈঠকে বসে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল, যাদের সঙ্গে আলোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
সচিবালয়ের বৈঠকে অ্যামচেম সভাপতি ও মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল জানান, তাদের সংগঠনের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। তিনি বলেন, সরকার যদি ব্যবসাবান্ধব ও সহায়ক নীতিমালা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে আরও প্রায় সমপরিমাণ অর্থাৎ ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আলোচনায় গুরুত্ব পায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজীকরণ, জ্বালানি সরবরাহে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষা জোরদার এবং সরকার-বেসরকারি খাতের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা গড়ে তোলার বিষয়গুলো। প্রধান উপদেষ্টা অ্যামচেমের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার প্রশংসা করে বলেন, দেশের অর্থনীতি একটি নতুন রূপান্তরের ধাপে প্রবেশ করেছে এবং বিনিয়োগের জন্য অনুকূল একটি পরিবেশ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়ার পর এখন সরকারের মূল কাজ হলো সেগুলো বাস্তবে কার্যকর করা। নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে খোলামেলা সংলাপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরির ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি সরকারের পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি অ্যামচেমের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আসন্ন ৩০তম মার্কিন বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকতে তাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে, যে মেলাটি যৌথভাবে আয়োজন করছে অ্যামচেম বাংলাদেশ ও ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস।
এই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
অ্যামচেম আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত সরকারি সংস্কার পরিকল্পনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানিয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমতি ও লাইসেন্স দেওয়া, একক জানালা পদ্ধতি চালু, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালনা, নিয়মকানুন পালনের জটিলতা কমানো, মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং শুল্ক ব্যবস্থাপনা সরলীকরণের উদ্যোগগুলোকে সাধুবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, শুধু সংস্কারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়—বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এ লক্ষ্যে সরকার, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অ্যামচেমের সমন্বয়ে একটি পৃথক টাস্কফোর্স বা ‘ডিজিটাল অর্থনীতি পরামর্শক ফোরাম’ এবং একটি ‘সরকারি-বেসরকারি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে অ্যামচেম।
সংগঠনটির মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে করনীতি ও শুল্ক ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ, এবং সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ইউএসবিবিসির সভাপতি ও মার্কিন চেম্বার অব কমার্সের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট অতুল কেশাপ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা বিপুল এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি এক লাখ কোটি ডলারের মাইলফলক ছুঁতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা বাড়ানো, জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা এবং রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি এই অগ্রযাত্রায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে অংশীদার হয়ে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও মতবিনিময় হয় বৈঠকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবা এক ছাতার নিচে আনতে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তুতি চলছে, যার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। গত পাঁচ থেকে ছয় মাসে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সমন্বিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্বালানি খাত নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাবগুলো সরকার পর্যালোচনা করছে, যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনার একটি অংশ। এ ছাড়া খাদ্যশস্য ও জ্বালানি সরবরাহ খাতে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় স্তরেই বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে অ্যামচেমের পক্ষ থেকে শুধু বাজারে প্রবেশাধিকার নয়, এর বাইরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল উদ্ভাবন, ক্লাউড কম্পিউটিং ও সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনবিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক শিল্প উৎপাদনব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে।
সামগ্রিকভাবে দুটি বৈঠকের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে গতি পেতে যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা মূলত নির্ভর করছে সরকারের ঘোষিত সংস্কারগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, নীতিগত ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায়—তার ওপর।

