দেশজুড়ে তীব্র গরমের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে গ্রামীণ জনপদ। কোথাও কোথাও দিনে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় নিজেদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা চেয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে চিঠি দিয়েছে একাধিক বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা।
জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে বিতরণ কোম্পানি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। ফলে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হচ্ছে তাদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন কিংবা সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষমতা তাদের হাতে নেই—তারা শুধু গ্রিড থেকে যেটুকু বরাদ্দ পান, সেটুকুই গ্রাহকদের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারেন। কিন্তু বরাদ্দ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে সরাসরি তাদের ওপর।
একাধিক জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও বিতরণ অফিস জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে ফোনে হুমকির শিকার হয়েছেন। যেকোনো সময় উপকেন্দ্র বা কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর হতে পারে বলে শঙ্কিত তারা। এ কারণে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে জরুরি নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন জানানো হয়েছে, বিশেষ করে রাতের বেলায় পুলিশি টহল জোরদারের অনুরোধ করা হয়েছে।
সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তির চিত্রও ভয়াবহ। কোথাও কোথাও দিনরাত মিলিয়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হচ্ছে, শিশু-বৃদ্ধরা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, সন্তানদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। কিছু এলাকায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ কর্মীদের অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটিয়েছেন।
এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একাধিক জটিলতা। সমুদ্রে ভাসমান একটি এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক গোলযোগের পর থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে, ফলে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় চলতে পারছে না। একইসঙ্গে খারাপ আবহাওয়ায় কয়লা খালাসে বিঘ্ন এবং বকেয়া বিল সংক্রান্ত জটিলতায় বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গ্রিডের কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পরিমাণও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অন্যদিকে গরমের কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি।
সরকারি হিসাব বলছে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদার শীর্ষ মুহূর্তে সরবরাহ করা গেছে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো, যেখানে চাহিদা ছিল ষোলো হাজারের বেশি। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে, কারণ জ্বালানি সরবরাহ সীমিত। তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালালে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায় বলে সেগুলোও সীমিত পরিসরে চালানো হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের একটি উপজেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থানীয় কার্যালয় থানায় লিখিত আবেদন করে জোনাল অফিস, উপকেন্দ্র ও অভিযোগকেন্দ্রে রাতভর পুলিশি প্রহরা চেয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে সাদা পোশাকে সদস্য মোতায়েন করে টহল অব্যাহত রাখা হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের এক জেলা শহরেও প্রায় একই চিত্র। সেখানকার বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেকেরও কম, ফলে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে এবং কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে হামলার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের একটি জেলায়ও একই কারণে জেলা প্রশাসকের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। চিঠিতে বলা হয়েছে, একাধিক দিন ধরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকেরও কম থাকায় এলাকাজুড়ে লোডশেডিং সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার পর হঠাৎ সংযোগ চালু হলে ফ্রিজ, পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্র একসঙ্গে সচল হয়ে যাওয়ায় চাহিদা আরও বেড়ে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, দিনে মাত্র তিন-চার ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ মিলছে, তাও বিচ্ছিন্নভাবে অল্প অল্প সময়ের জন্য। গরমে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে, ফ্রিজ-ফ্যান চলছে না, ভোল্টেজও থাকছে অস্বাভাবিক কম।
সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বকেয়া বিল আদায়ে গেলে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা মৌখিক হুমকি ছাড়াও শারীরিক হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এলাকাভিত্তিক একটি মাঝারি আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখা গেলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হতো বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দেশের বিদ্যুৎ খাতের সংকট এখন কেবল প্রযুক্তিগত বা সরবরাহজনিত সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই—এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে। জ্বালানি আমদানি, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার এবং গ্রিড ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া গেলে আসছে দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

