হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের মামলার প্রস্তুতি ও বিচারিক কাজে গবেষণাগত সহায়তা দিতে আইন সহকারী ও গবেষণা সহযোগী নিয়োগের সুপারিশ প্রণয়নে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্পূরক এক আবেদনের শুনানি শেষে এ নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিকে আগামী তিন মাসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিষয়টি সামনে আসে ২০২১ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (পারিতোষিক ও বিশেষাধিকার) আইন এবং ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (ছুটি, পেনশন ও বিশেষাধিকার) আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা একটি রিটের ধারাবাহিকতায়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনসহ আইনজীবী ও আইন শিক্ষার্থী মিলিয়ে ১৩ জন গত নভেম্বরে ওই রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ২৪ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় রিট আবেদনকারী পক্ষ গত ৯ আগস্ট একটি সম্পূরক আবেদন করে। এতে হাইকোর্ট বিভাগের প্রত্যেক বিচারপতির জন্য চুক্তিভিত্তিক আইন সহকারী ও গবেষণা সহযোগী, গবেষণা কর্মকর্তা অথবা গবেষণা শিক্ষানবিশ নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশনা চাওয়া হয়।
মঙ্গলবার সেই আবেদনের শুনানি হয়।
রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাঁকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ জীসান হায়দার।
পরে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের জন্য গবেষণা সহযোগী নিয়োগের বিষয়ে সুপারিশ তৈরির জন্য আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তিন মাসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে হবে।
মামলার চাপ, গবেষণা সহায়তার ঘাটতি
রিট আবেদনকারীদের বক্তব্য, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে মামলার জটও বিচারিক ব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বিচারপতিদের জন্য আলাদা গবেষণাগত সহায়তা না থাকা বিচারপ্রক্রিয়ার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
আবেদনে বলা হয়, বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে কাজ করার মতো নিবেদিত আইন সহকারী, গবেষণা সহযোগী, গবেষণা কর্মকর্তা বা গবেষণা শিক্ষানবিশ নেই। ফলে মামলার নথি বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট আইন ও নজির পর্যালোচনা এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের প্রস্তুতিতে বিচারপতিদের ওপরই বড় ধরনের গবেষণার ভার পড়ে।
আইন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বিচারকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখেই গবেষণাগত সহায়তার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা গেলে মামলার প্রস্তুতি আরও সুসংগঠিত হতে পারে। বিশেষ করে জটিল সাংবিধানিক, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় দেশি-বিদেশি আইন, পূর্ববর্তী রায় ও সংশ্লিষ্ট নথি দ্রুত পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এমন সহায়তা কার্যকর হতে পারে।
তবে কারা গবেষণা সহযোগী হিসেবে নিয়োগ পাবেন, তাঁদের যোগ্যতা কী হবে, নিয়োগের পদ্ধতি কেমন হবে এবং বিচারপতিদের সঙ্গে তাঁদের দায়িত্বের সীমা কোথায় থাকবে, এসব বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমিটির সুপারিশে এসব প্রশ্নের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো আসতে পারে।
ফলে তিন মাসের মধ্যে জমা দিতে বলা এই প্রতিবেদন শুধু নিয়োগের সুপারিশে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বিচারপতিদের গবেষণা সহায়তার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরির পথ দেখাবে, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।

