বেনাপোল থেকে ফলভর্তি ট্রাক নিয়ে পুরান ঢাকার একটি পাইকারি বাজারে পৌঁছান এক ট্রাকচালক। বুড়িগঙ্গার তীরের একটি নির্ধারিত পার্কিং ইয়ার্ডে গাড়ি রাখার পরপরই হাতে খাতা নিয়ে হাজির হন এক ব্যক্তি, নিয়ে যান দুই হাজার টাকা—কোনো রশিদ ছাড়াই। ট্রাকচালক পরে জানান, ফলভর্তি ট্রাকের জন্য দিতে হয় দুই হাজার টাকা, খালি ট্রাকের জন্য এক হাজার। টাকা না দিলে জোটে মারধর, তাই বাধ্য হয়েই মেনে নেন সবাই।
এভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলছে পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী ফলের আড়তে আসা ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ের কারবার, যেখানে সরকারি ইজারা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ঢাল হিসেবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী, ওই পার্কিং এলাকায় ট্রাক, বাস কিংবা কাভার্ড ভ্যান রাখার জন্য সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র একশ টাকা। মিনিবাস ও ছোট ট্রাকের জন্য তা আরও কম। অথচ বাস্তবে ট্রাকপ্রতি আদায় করা হচ্ছে এক থেকে দুই হাজার টাকা, আর কনটেইনারবাহী বড় যানবাহন থেকে নেওয়া হচ্ছে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত—যা নির্ধারিত ফির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
জানা গেছে, প্রায় এক দশক আগে নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে হাঁটার পথ, সীমানাপ্রাচীর ও একটি সুশৃঙ্খল পার্কিং ইয়ার্ড তৈরি করেছিল সংশ্লিষ্ট নৌ কর্তৃপক্ষ। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এই জায়গা ইজারা দেওয়ার কথা থাকলেও একটি আদালতে বিচারাধীন মামলার কারণে গত দুই অর্থবছরে নতুন করে ইজারা দেওয়া যায়নি। ফলে প্রতি মাসে পুরোনো ইজারার মেয়াদ বাড়িয়েই চলছে কার্যক্রম, আর এই সুযোগেই চলছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ফি আদায়ের কোনো সুযোগ নেই, কেউ এমনটা করলে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁদার একটি অংশ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কাছেও পৌঁছায়, যে কারণে বিষয়টি জেনেও তারা নীরব থাকেন। তাদের মতে, লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় থাকার কথাটি অনেকটাই একটি অজুহাত মাত্র।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, পার্কিং ইয়ার্ডের ভেতরে বাঁশ-কাঠের একটি অস্থায়ী দোকানে বসে টাকা গোনায় ব্যস্ত এক ব্যক্তি নিজেকে স্থানীয় একটি ওয়ার্ডের যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জানান, ঘাটের ইজারা নিয়েছেন অন্য কয়েকজন, তিনি শুধু জেটি পয়েন্টের দায়িত্বে থেকে টাকা তোলেন এবং তা ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাঠিয়ে দেন। ইজারাদারের নাম জানতে চাইলে তিনি তা প্রকাশ করতে রাজি হননি, নিজেকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক একজন কর্মচারী হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতো মোট ছয়জন ব্যক্তি এই টাকা তোলার কাজে যুক্ত বলে জানা গেছে, যাদের অধিকাংশই স্থানীয় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রাক আসে এই আড়তে। প্রতি ট্রাক থেকে দুই হাজার টাকা করে হিসাব করলে দৈনিক আদায় হয় প্রায় তিন লাখ টাকা, যা মাসে দাঁড়ায় প্রায় নব্বই লাখ টাকায়। খালি ট্রাকের হিসাব যোগ করলে মাসিক আদায়ের পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। শুধু ট্রাক নয়, এলাকার ছোট ছোট চা ও খাবারের দোকান থেকেও দৈনিক নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয় বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্ষুদ্র চা বিক্রেতা জানান, বেচাবিক্রি হোক বা না হোক, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে টাকা দিতেই হয়, নইলে দোকান তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে এই পার্কিং ইয়ার্ড এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছিলেন এক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, যিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত বছরের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকে পার্কিং ইয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীর হাতে। নতুন ইজারার দরপত্রের সময় ঘনিয়ে এলে সাবেক ইজারাদারের পক্ষে একটি মামলা দায়ের হওয়ায় নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ফলে আদালতের নির্দেশে সাময়িকভাবে মেয়াদ বাড়িয়েই চলছে পুরোনো ব্যবস্থা।
স্থানীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে তিনজন রাজনৈতিক কর্মী এই পার্কিং ইয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে চাঁদা আদায় করছেন। তাদের একজন সংবাদমাধ্যমকে জানান, সাবেক ইজারাদার আত্মগোপনে যাওয়ার আগে তাদের হাতে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করে গেছেন, তখন থেকেই তারা ইজারার মাসিক মূল্য পরিশোধ করে পার্কিং ইয়ার্ড পরিচালনা করছেন। তবে সাবেক ইজারাদার প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি; তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে এবং স্থানীয় ব্যবসা দেখাশোনাকারী একজন প্রতিনিধিও এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
প্রায় শতবর্ষী এই ফলের আড়তটি দেশের বৃহত্তম পাইকারি ফল ব্যবসাকেন্দ্রগুলোর একটি, যেখানে দৈনিক শতকোটি টাকার বেচাকেনা হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু পার্কিং নয়, আড়তে ট্রাক প্রবেশ করলেই বিভিন্নভাবে চাঁদা দিতে হয়, আর এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয় ফলের দামের সঙ্গে। স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যকে বিষয়টি অবহিত করা হলে তিনি পার্কিং খরচ কমানোর নির্দেশ দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একটি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতৃত্বে থাকা এক ব্যক্তি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পার্কিং বাবদ বাড়তি ব্যয় হলে সেই হিসাব ধরেই নির্ধারণ করা হয় ফলের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য—অর্থাৎ এই চাঁদার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়েই।

