পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি ঘিরে দীর্ঘদিনের যেসব অভিযোগ ছিল, সরকার পরিবর্তনের পরও তার ছায়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি বাহিনীটি। নেতৃত্বে রদবদল ও বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঘুস লেনদেন, বদলি বাণিজ্য, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং প্রভাবশালীদের পক্ষ নেওয়ার মতো অভিযোগ এখনও নতুন করে সামনে আসছে। ফলে পুলিশ বাহিনীর প্রকৃত রূপান্তর কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগের রাজনৈতিক সরকারের আমলে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা কর্মকর্তারা বাড়তি সুবিধা পেতেন, আর ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের প্রত্যন্ত এলাকায় বদলি, পদোন্নতি আটকে রাখা কিংবা জোরপূর্বক অবসরে পাঠানোর মতো ঘটনা তখন প্রায় প্রকাশ্য বিষয় ছিল। গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় সমর্থন ছাড়া সুযোগ মেলা কঠিন ছিল, আর এসব পদায়নে ঘুস লেনদেনের অভিযোগও ছিল দীর্ঘদিনের।
বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি আগের সরকারের সময় বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন, তার ভাষ্য অনুযায়ী তখন দলীয় আনুগত্য ছাড়া কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পাঠানো হতো না; কোনোভাবে সেই বাছাই প্রক্রিয়া পার হয়ে গেলে হয় তাকে দ্রুত প্রত্যাহার করা হতো, নয়তো মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সেই পদে থাকতে হতো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ সুপারও জানান, জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে এখনো দলীয় বিবেচনাই মুখ্য বিষয় হিসেবে কাজ করছে, যার ফলে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ, ব্যাপক আলোচিত সংস্কারের উদ্যোগ সত্ত্বেও পুলিশের মৌলিক চরিত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে। সম্প্রতি পুলিশপ্রধানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নিয়োজিত একজন সদস্যের বদলি বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি গোপন অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছে বাহিনীটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক অডিওতে অর্থের বিনিময়ে বদলি করানোর তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে একাধিক চক্র সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন এবং বিরোধী মতের বিরুদ্ধে বাহিনীকে ব্যবহারের অভিযোগও অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
শুধু ঘুস-বাণিজ্যই নয়, গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উঠেছে খোদ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে। খুলনায় একটি এলাকায় গভীর রাতে মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের একটি দল অস্ত্রের মুখে বাড়িতে ঢুকে বাসিন্দাদের মারধর করে স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নেওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পরে একজন কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে রাজশাহীতে এক উপপরিদর্শকের ঘুস লেনদেনের অডিও ফাঁস হয়েছিল, যেখানে তাকে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে সেই অর্থ ভাগাভাগি করার কথা স্বীকার করতে শোনা যায়। একইভাবে নেত্রকোনার একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার একটি বক্তব্যের অডিও ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাকে প্রত্যাহার করা হয়, যেখানে তাকে পুলিশের চাকরিকে একধরনের ব্যবসার সঙ্গে তুলনা করতে শোনা যায়।
সাধারণ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, থানায় গিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়া এখনো কঠিন। রাজধানীর একটি এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া এক ব্যক্তি জানান, আহত অবস্থায় থানায় গিয়েও তাৎক্ষণিকভাবে মামলা নেওয়া হয়নি, পরে ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই কেবল ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। রাজধানীর অন্য একটি এলাকায় স্থানীয় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েও ব্যবস্থা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন এক গৃহিণী, উল্টো অভিযোগ করার পর তাকে আবারও হামলার শিকার হতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ ও অভিযান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, যথেচ্ছ গ্রেপ্তার বা কৃত্রিম গুমের মতো ঘটনা থেকে বাহিনী এখন অনেকটাই সরে এসেছে বলে দাবি তার। ন্যূনতম বলপ্রয়োগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি, যদিও এ কারণে অনেকে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় বলেও সমালোচনা করছেন।
অপরাধবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুলিশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে, এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাদের মতে, কোনো বাহিনী নিজে থেকে বদলে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়; বরং প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা গেলেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
একজন অপরাধবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ বলেন, রাজনীতিকরণের জায়গা থেকে বাহিনীটি এখনো ন্যূনতম বদলায়নি এবং এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। তার পর্যবেক্ষণ, জনগণের প্রতি আচরণে কিছুটা নমনীয়তা এলেও ভেতরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা মূলত আগের ধারাতেই চলছে।
অন্য একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে, সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে যে ধরনের সংস্কার প্রত্যাশিত ছিল, তা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তার মতে, পুলিশ এখনো প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো একটি আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যা পরিবর্তন করে একটি স্বাধীন ও আধুনিক আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। তিনি মনে করেন, বাহিনীর চাকরির শর্ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কেবল প্রত্যাশা করলেই পুলিশ বদলে যাবে না।

