নারীদের জন্য নির্ধারিত বাসসেবায় এবার ই-টিকিট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও সহজ। ঢাকাসহ চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৪টি রুটে ধাপে ধাপে এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। এতে বাসে ওঠার আগে টিকিট সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি অপেক্ষার সময় ও কাউন্টারনির্ভরতা কমবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সম্প্রতি বিআরটিসি ও সহজের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। চুক্তির আওতায় নারী যাত্রীদের জন্য পরিচালিত নির্ধারিত বাসসেবায় ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হবে। বিআরটিসির ১০টি ডিপোর ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা থাকলেও টিকিট সংগ্রহ ও বাসে ওঠার প্রক্রিয়ায় যদি দীর্ঘ অপেক্ষা বা অতিরিক্ত ঝামেলা থাকে, তাহলে সেবাটির সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া যায় না। ই-টিকিট সেই জায়গাটিতে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
বিশেষ করে ব্যস্ত শহরে গণপরিবহনে যাতায়াত করা নারীদের জন্য সময়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। টিকিট কাটতে আলাদা করে অপেক্ষা করতে হলে কিংবা বাস ছাড়ার আগে কাউন্টারে গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হলে যাত্রার পুরো প্রক্রিয়াই দীর্ঘ হয়ে যায়। ডিজিটাল টিকিটিং চালু হলে সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ মোবাইলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। ফলে যাত্রীরা আগে থেকেই টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারবেন এবং বাসে ওঠার সময়ও কম ঝামেলা হবে। একই সঙ্গে টিকিট বিক্রির তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হওয়ায় কোন রুটে কত যাত্রী, কোন সময়ে চাহিদা বেশি এবং কোথায় অতিরিক্ত বাসের প্রয়োজন এসব বিষয়েও ভবিষ্যতে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লার মতে, নারী বাসসেবায় ডিজিটাল টিকিট চালু হলে অপেক্ষার সময় কমানোর পাশাপাশি যাত্রীদের আস্থাও বাড়তে পারে। আর সহজের পরিচালক শাকিল জোয়াদ রহিম বলেছেন, গণপরিবহনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখানে শুধু টিকিট বিক্রির পদ্ধতি বদলানো হচ্ছে না; সরকারি বাসসেবাকে ধীরে ধীরে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার একটি উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য সেবা যত সহজ ও নির্ভরযোগ্য হবে, গণপরিবহনে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহারও তত বাড়বে।
তবে ই-টিকিট চালু করলেই নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের সব সমস্যা সমাধান হবে না। বাসের সময়সূচি ঠিক রাখা, পর্যাপ্ত বাস নিশ্চিত করা, যাত্রীদের নিরাপত্তা, চালক ও কর্মীদের আচরণ এবং অভিযোগের দ্রুত সমাধান এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি ডিজিটাল টিকিট ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হবে, যখন টিকিট কাটার পর যাত্রী বাস্তবে সময়মতো ও নিরাপদে বাসসেবা পাবেন। তাই ই-টিকিটকে শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা হিসেবে না দেখে পুরো নারী বাসসেবাকে আরও সংগঠিত করার অংশ হিসেবে দেখাই গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে আরেকটি বড় সুবিধা হতে পারে যাত্রীসেবার তথ্য ব্যবস্থাপনায়। এতদিন টিকিট বিক্রি ও যাত্রী চলাচলের তথ্য বিভিন্নভাবে সংরক্ষিত হলে একটি রুটের প্রকৃত চাহিদা বোঝা কঠিন হতে পারে। ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়মিত তথ্য পাওয়া গেলে কোন রুটে কখন বেশি যাত্রী হয়, কোথায় সেবা বাড়ানো দরকার কিংবা কোন সময়ে বাসের সংখ্যা সমন্বয় করা প্রয়োজন এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে। সরকারি পরিবহন ব্যবস্থায় এমন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে সেবার মান বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বিআরটিসি ও সহজের এই উদ্যোগের মাধ্যমে ১৪টি রুটে নারী যাত্রীদের জন্য ই-টিকিট সুবিধা ধীরে ধীরে চালু হবে। সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি শুধু টিকিট কেনার ঝামেলা কমাবে না, নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বাসসেবাকে আরও সহজ, সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পথও তৈরি করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটির সাফল্য নির্ভর করবে ই-টিকিটের পাশাপাশি বাসের সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা ও নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হচ্ছে তার ওপর।

