রাজধানীর মিরপুরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিজস্ব আবাসিক এলাকায় থাকা তিনটি ডুপ্লেক্স বাড়ি বছরের পর বছর ফাঁকা পড়ে থেকে ধ্বংসের মুখে। প্রায় এক দশক আগে বসবাসকারীরা চলে যাওয়ার পর থেকে এসব বাড়ির আর কোনো ব্যবহার হয়নি, অথচ এগুলো তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি টাকা। কর্তৃপক্ষের কাছে এখনো নেই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, কীভাবে এই মূল্যবান সম্পদ আবার কাজে লাগানো যায়।
২০০১ সালে মিরপুর ১৪ নম্বরে প্রায় তিন একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল কমিশনের এই আবাসিক প্রকল্প। মোট নয়টি ভবনে জায়গা পেয়েছিলেন প্রায় ৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, যদিও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০০। এই কমপ্লেক্সেই কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের জন্য আলাদাভাবে তৈরি হয়েছিল তিনটি দোতলা বাড়ি। চেয়ারম্যানের বাড়িটির আয়তন প্রায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট, আর সদস্যদের দুটি বাড়ির প্রতিটি প্রায় ২৬০০ বর্গফুট করে।
তথ্য বলছে, চেয়ারম্যানের জন্য নির্ধারিত বাড়িতে আজ পর্যন্ত কোনো চেয়ারম্যান বসবাস করেননি। শুধু ২০১০ সাল পর্যন্ত একজন কর্মকর্তা সেখানে ছিলেন, এরপর থেকে বাড়িটি একেবারেই খালি। সদস্যদের দুটি বাড়িতে ২০০২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট দশজন সদস্য পালাক্রমে থেকেছেন, তারপর থেকে সেগুলোও অব্যবহৃত।
সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, বাড়িগুলোর সামনের অংশ আগাছা আর ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা, লোহার জানালা-গ্রিলে ধরেছে মরিচা। কয়েক বছর আগে ভেঙে যাওয়া প্রধান ফটকের লোহার দরজার আর কোনো হদিস নেই। ভেতরে আসবাবপত্রও প্রায় নেই বললেই চলে, আর সেগুলো কখন সরানো হয়েছিল তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। একই সময়ে তৈরি হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবনগুলো এখনো ভালো অবস্থায় আছে এবং সেখানে মানুষ বসবাসও করছেন—যা এই তিনটি বাড়ির পরিত্যক্ত চেহারার সঙ্গে বেশ বৈপরীত্য তৈরি করে।
কমিশনে নতুন চেয়ারম্যান বা সদস্য যোগ দিলে তাঁদের মিরপুরের এই বাড়িতে ওঠার আমন্ত্রণ জানানো হতো, কিন্তু অধিকাংশই রাজি হননি। নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে থাকা সদস্যরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন—কারও গুলশানে নিজের বাড়ি আছে, কেউ উত্তরায় ভাড়া থাকেন, আবার কেউ মোহাম্মদপুরে নিজের পছন্দমতো এলাকায় বাসা নিয়েছেন। একজন সাবেক সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও সদস্যরা মূল বেতনের ৫৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা পান বলে অনেকেই নিজের সুবিধামতো এলাকায় থাকা পছন্দ করেন। এ ছাড়া আবাসিক এলাকাটি তৈরির সময় মিরপুরের ওই অংশের পরিবেশ এখনকার তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল, পাশে ছিল বস্তি এবং মশার উপদ্রবও ছিল বেশি—এসব কারণও বসবাসে অনাগ্রহের পেছনে কাজ করেছে বলে জানা গেছে।
অনেক সদস্য আবার নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক দায়িত্বে আসেন এবং সেখানে আগে থেকেই আবাসন-সুবিধা পান। কমিশনে দায়িত্ব পালনের সময় সেই সুবিধা ছেড়ে দিলে ফিরে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়—এই ভয়ও অনেককে মিরপুরের বাসা এড়িয়ে চলতে প্রভাবিত করেছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
সরকারি বাসা বরাদ্দ–সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা দখলে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। বরাদ্দকৃত বাসা ব্যবহার না করে খালি রেখে দেওয়া এবং একই সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতা নেওয়ার বিষয়টি বিধির আলোকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়ম অনুযায়ী এমন ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাতিলসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে তা কার্যকর হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে কর্তৃপক্ষও নতুন সদস্যদের এসব বাড়িতে ওঠার জন্য নিয়মিতভাবে আমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করে দিয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
আরেকটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে বরাদ্দ পাওয়া একটি ফ্ল্যাটে থাকছেন, কারণ মিরপুর ও ধানমন্ডিতে চেয়ারম্যানের জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসভবন দুটিই বর্তমানে বসবাসের অনুপযোগী বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রায় ২২ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ধানমন্ডির বাসভবনটিও গত আট বছর ধরে অব্যবহৃত, আর সেটি ব্যবহারযোগ্য করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি কাজ করছে।
এদিকে কমিশনের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত বিভাগ থেকে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব শাখায় একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে, যেখানে চেয়ারম্যানের ব্যবহৃত ওই ফ্ল্যাটের মেরামত, সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার জন্য বাজেট প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবের মধ্যে চেয়ারম্যানের গাড়িচালক ও সহকারীর থাকার জন্য নতুন কক্ষ তৈরির বিষয়ও রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—নিজস্ব বিপুল সম্পদ অব্যবহৃত রেখে বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানের ফ্ল্যাটে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ ব্যয় করে সংস্কার করানো কতটা যৌক্তিক। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশল বিভাগের পরিচালকের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, মিরপুর ও ধানমন্ডির সরকারি বাসভবন দুটি বর্তমানে বসবাসের উপযোগী না হওয়াতেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাটে থাকছেন। সেখানে স্থায়ী আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্যে, ছুটির দিনে বা অফিস সময়ের বাইরে জরুরি বৈঠক বা দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজনে সেখানে সীমিত পরিসরে একটি কর্মস্থল তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে সবকিছুই বিধিসম্মতভাবে করা হবে। মিরপুরের তিনটি ফাঁকা বাড়ি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়নি, আলোচনা হলে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কমিশনের এক সাবেক সদস্যের ভাষ্যমতে, অতীতেও এই ফাঁকা বাড়িগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। এলাকাটির জমির বাজারমূল্য অনেক বেশি হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে বিকল্প ব্যবহারের প্রস্তাবও উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকায় বাড়িগুলো এখন এতটাই বসবাস-অযোগ্য হয়ে পড়েছে যে নতুন করে সংস্কার করতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে, আর শুধু সংস্কারের জন্য সরকারি বরাদ্দ পাওয়াও সহজ নয়। ফলে এখনো এই মূল্যবান সরকারি সম্পদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

