দেশের প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রতিটি জেলায় পর্যায়ক্রমে গড়ে তোলা হবে ‘শিশু স্বর্গ’ নামের সমন্বিত সেবাকেন্দ্র, যেখানে চিকিৎসা থেকে শুরু করে শিক্ষা, থেরাপি, পুনর্বাসন, আবাসন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান—সবকিছুই মিলবে একই ছাদের নিচে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের অনেক প্রতিবন্ধী শিশু সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, বিশেষায়িত শিক্ষা বা পুনর্বাসন সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, যার ফলে তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাস্তবতা থেকেই সরকার এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে।
তাঁর ভাষায়, প্রতিবন্ধী শিশুরা কোনোভাবেই সমাজের বোঝা নয়, বরং সঠিক যত্ন ও প্রশিক্ষণ পেলে তারাও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম—আর এই বিশ্বাস থেকেই জেলায় জেলায় শিশু স্বর্গ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রচেষ্টায়। প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকবে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, প্রতিবন্ধিতা চিহ্নিত করা ও চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা। এরপর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, শিক্ষা, থেরাপি ও প্রশিক্ষণের মূল দায়িত্ব পালন করবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, কোনো পরিবারকে যেন সন্তানের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানে ছোটাছুটি করতে না হয়, সেই লক্ষ্যেই এটি হবে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কেন্দ্র। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্পিচ থেরাপিস্ট বা অকুপেশনাল থেরাপিস্টের অপ্রতুলতার কারণে বহু শিশু প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—নতুন এই উদ্যোগ ধাপে ধাপে সেই ঘাটতি পূরণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সেবার পরিধি: প্রতিটি শিশুর বয়স ও চাহিদা অনুযায়ী তৈরি হবে পৃথক সেবা পরিকল্পনা। এতে থাকবে—
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
- ফিজিওথেরাপি ও স্পিচ থেরাপি
- মনোসামাজিক কাউন্সেলিং
- বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা
- অভিভাবকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, শুধু শিশু নয়—পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া কোনো পুনর্বাসন কার্যক্রমই পূর্ণাঙ্গ সফলতা পায় না। তাই অভিভাবকদের সচেতন ও দক্ষ করে তোলার ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু আর্থিক ভাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিশুরা যেন বড় হয়ে আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, সেজন্য ছোটবেলা থেকেই তাদের শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জীবনমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যারা হস্তশিল্প বা অন্য কোনো পণ্য তৈরি করবে, তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণেও সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, লক্ষ্য দাননির্ভর নয়, বরং মর্যাদাসম্পন্ন ও স্বনির্ভর একটি সমাজ গড়া, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সামাজিক কুসংস্কার ও সচেতনতার অভাবে অনেক সময় প্রতিবন্ধী শিশুর পরিবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিশু স্বর্গ কেবল সেবা দেবে না, বরং সমাজে প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতেও কাজ করবে। তাঁর ভাষায়, মানুষ যেন প্রতিবন্ধিতাকে করুণার দৃষ্টিতে না দেখে অধিকার ও মানবিকতার দৃষ্টিতে দেখে—এটাই কাম্য।
এসব কেন্দ্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা উপকরণ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেরও ব্যবস্থা থাকবে, যাতে শিশুরা আনন্দের মধ্য দিয়ে শিখতে পারে এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারগুলো যেন সহজে সেবা পায়, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই ধাপে ধাপে জেলা পর্যায়ে কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এর ফলে রাজধানীনির্ভরতা কমবে এবং মানুষ নিজ জেলাতেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে। এজন্য স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে।
প্রতিমন্ত্রী শেষে বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়ন কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়—এটি একটি জাতীয় সমন্বিত দায়িত্ব, যেখানে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিশু স্বর্গ কেবল একটি ভবন তৈরির প্রকল্প নয়, বরং প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একটি মানবিক উদ্যোগ।

