নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমান্তবর্তী চিলাহাটি স্থলবন্দর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ পড়ে আছে, আর তার সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা অবকাঠামোর যাবতীয় সম্ভাবনাও। প্রায় দুইশ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি রেলস্টেশন ভবন, প্ল্যাটফর্ম, ফুটওভারব্রিজ, অতিথিশালা আর শুল্ক-ব্যাংকিং সুবিধাসংবলিত স্থাপনাগুলো এখন কার্যত অব্যবহৃত, অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
সীমান্তের কাছে গ্রামীণ জনপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল, আধুনিক নকশার স্টেশন ভবনটি দূর থেকে দেখলে মনে হয় সদা কর্মচঞ্চল কোনো স্থাপনা। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায় বাস্তবতা ভিন্ন। বারান্দাজুড়ে সারিবদ্ধ পাখাগুলো দীর্ঘদিন ঘোরেনি, জানালার ওপাশে প্যাকেটবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে চেয়ার-টেবিল আর স্টিলের আসবাব, যার ওপর জমেছে ধুলার আস্তরণ। দোতলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলো ফাঁকা, তিনতলায় রেস্তোরাঁর জন্য রাখা জায়গাও অব্যবহৃত। পাশের দোতলা ভিআইপি অতিথিশালাটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি, গার্ডরুম—সবকিছুই এখন অকেজো। সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনে জমেছে মরিচা।
এই বিপুল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে, ভারতের সঙ্গে রেলপথে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য সামনে রেখে। ২০২১ সালের ১ আগস্ট থেকে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল, পরের বছর যুক্ত হয়েছিল যাত্রীবাহী ট্রেন সেবা। কিন্তু ২০২৪ সালের মধ্যেই এই কার্যক্রমে ভাটা পড়তে শুরু করে। অবশেষে ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি দেখিয়ে বন্দরটি বন্ধ ঘোষণা করে।
চিলাহাটি সীমান্তের ওপারে অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি সীমান্ত জনপদ। এই রেলপথ ব্রিটিশ আমলে চালু হয়েছিল, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর পুনরায় চালু হওয়া এই সংযোগ ফের বন্ধের মুখে পড়ল।
২০১৩ সালে সরকারিভাবে চিলাহাটিকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হলেও প্রকৃত কার্যক্রম শুরু হতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যায়। রেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সীমান্ত পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল আশি কোটি টাকা, যা শেষমেশ গিয়ে দাঁড়ায় ১২৮ কোটি টাকায়। রেলের ওয়াগন, সড়ক, বিদ্যুৎ সংযোগসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় দুইশ কোটি টাকায়। এই অর্থে রেললাইনের সংখ্যা বাড়ানো, প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ, ফুটওভারব্রিজ তৈরি এবং কোচ পরিষ্কার-মেরামতের জন্য শেড নির্মাণসহ নানা কাজ সম্পন্ন হয়। উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দাবির প্রেক্ষিতে চিলাহাটিতেই ইমিগ্রেশন সেবা চালুর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল, যদিও এর আগেই স্থলবন্দরের কার্যক্রম থমকে যায়।
স্থানীয় স্টেশন কর্তৃপক্ষের বরাত অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে মূলত ভারত থেকে পাথরবোঝাই ট্রেন আসত, মাসে গড়ে চার থেকে পাঁচটি। ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতে পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি কমতে থাকে, এক পর্যায়ে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একই বছরের জুলাই-আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও স্থগিত হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, বন্দরের কার্যক্রম চালু থাকাকালীন শ্রমিক ও পণ্য খালাসকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিয়মিত আনাগোনায় এলাকাটি প্রাণবন্ত ছিল। তখন আশপাশের জমির দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিল, অনেকে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায় বিনিয়োগেরও পরিকল্পনা করছিলেন। একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, বন্দর চালু থাকার সময় দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল, কিন্তু কার্যক্রম বন্ধের পর সেই মানুষগুলো কাজ হারিয়েছেন। বন্দরটি দ্রুত ফের চালু হলে স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে বলে তিনি মত দেন।
আর্থিক ক্ষতির চিত্রও স্পষ্ট রেলওয়ের হিসাবে। বন্দর সচল থাকাকালে প্রতিটি চালানে পাথরের পরিমাণ অনুযায়ী রেল কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাবদ পেত ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা, মাসিক হিসেবে যা দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকায়। তবে স্টেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাব বলছে, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে যেখানে আয় হয়েছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৫ লাখ টাকায়—অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। স্টেশনে কর্মরত পঞ্চাশজনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, বর্তমানে কেবল অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে এই পথে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরে চিলাহাটি স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিলেন এই যুক্তিতে যে, এটি পুরোদমে চালু থাকলে ভারত ছাড়াও নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা এখন সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। স্থানীয় চেম্বারের একজন সাবেক নেতা জানান, আগে চিলাহাটি হয়ে কম খরচে পাথর আনা যেত, এখন বিকল্প পথে ট্রাকে করে আনতে খরচ বেড়ে গেছে। এতে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকে বেকার হয়ে পড়েছেন। তাঁর মতে, বন্দর বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সরকার—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাই উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থে দ্রুত এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্দরটি আপাতত পুনরায় চালুর কোনো সম্ভাবনা নেই। তাঁর ভাষ্যে, এটি সচল করতে হলে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন, আর তার জন্য প্রয়োজন উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক আলোচনা ও সিদ্ধান্ত।
সব মিলিয়ে চিলাহাটি স্থলবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন সরকারি বিনিয়োগের অপচয়ের একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না এলে এই বিপুল অবকাঠামো ভবিষ্যতেও অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

