সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনল সরকার। “গণ খাতে ক্রয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬” নামে নতুন এক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকা ব্যবসায়ীদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ছোট ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত কেনাকাটার পথ সহজ করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও এসেছে এই অধ্যাদেশে।
গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সংশোধনী অনুমোদন পায়। এর একদিন পরই, সোমবার, আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংশোধিত অধ্যাদেশের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নতুন অধ্যাদেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো “সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি” ধারণাটি। এখানে এমন ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে, যাদের বৈধ নিবন্ধন বা লাইসেন্স থাকার পরও গত দুই দশকে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় পরিবেশ বা সুযোগ তৈরি হয়নি। অধ্যাদেশে তাদের জন্য আলাদাভাবে টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
শুধু বঞ্চিতদের জন্যই নয়, নতুন যারা ব্যবসায় আসছেন তাদের জন্যও সহজ শর্ত রাখা হয়েছে। যেমন—কোনো কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রয়োজন না হলে দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা চাওয়া যাবে না, নির্দিষ্ট পরিমাণ টার্নওভার বা আগের সরকারি কাজের অভিজ্ঞতাও বাধ্যতামূলক করা যাবে না। তবে কাজ যদি জটিল বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়, সেক্ষেত্রে যৌক্তিক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার শর্ত রাখার সুযোগ থাকছে। ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হয়েছে, যাতে তারা সহজে টেন্ডারে অংশ নিতে পারেন।
দেশীয় শিল্প রক্ষায়ও বেশ কিছু পদক্ষেপ রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে। বাংলাদেশে তৈরি বা উৎপাদিত পণ্যকে সরকারি কেনাকাটায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যার লক্ষ্য স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি কোনো টেন্ডারে অংশ নিতে চায়, তাহলে তাদের অবশ্যই বাংলাদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার এই শর্ত শিথিল করতে পারবে, আর যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় অংশীদারের ন্যূনতম অংশ কত হবে, তা পরে বিধিমালার মাধ্যমে ঠিক করা হবে।
জরুরি অবস্থার জন্য আলাদা একটি ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে, যাকে সরকার নাম দিয়েছে “বিকল্প সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা।” জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বার্থ বা বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকটের সময় প্রচলিত দীর্ঘ টেন্ডার প্রক্রিয়ার সব ধাপ পার না করেই সরাসরি বা একক উৎস থেকে কেনাকাটার সুযোগ থাকবে এই ব্যবস্থায়। উদ্দেশ্য হলো, সংকটকালে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে জরুরি পণ্য বা সেবা পেতে দেরি না হয়।
টেন্ডার প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে বেশ কিছু নিয়মও স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রাক্-যোগ্যতা যাচাই, সব প্রতিযোগীর জন্য সমান সুযোগ, যথাযথ প্রচার এবং দরপত্র জমার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার বিষয়গুলো এখন আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব আলাদাভাবে যাচাই করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে শুধু সবচেয়ে কম দর নয়, কাজের মান, টেকসই সক্ষমতা ও কারিগরি দক্ষতাও মূল্যায়নে গুরুত্ব পায়। চুক্তি স্বাক্ষরের পর অন্য প্রতিযোগীদের ফলাফল জানানো এবং বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও চুক্তির তথ্য প্রকাশ করাও এখন থেকে বাধ্যতামূলক।
সীমিত দরপত্র পদ্ধতি বা এলটিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমারেখা টানা হয়েছে—বিশেষায়িত পণ্য, সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারী থাকা পণ্য, জরুরি প্রয়োজন এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্যের ক্ষেত্রেই কেবল এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে। আগে সমান সর্বনিম্ন দর হলে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত কাজে লটারির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ম ছিল, যা এখন তুলে দেওয়া হয়েছে। এর বদলে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতার সঙ্গে কারিগরি বিষয়, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও শর্তাবলি নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ থাকবে, তবে দাম আরও কমানোর জন্য দর-কষাকষি করা যাবে না।
দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি বা চুক্তি বাস্তবায়নে গুরুতর ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলে এখন থেকে সরাসরি ব্যবস্থা না নিয়ে প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে এবং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে নিজের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হবে।
এই সংস্কারের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে দেশের সরকারি কেনাকাটার বর্তমান চিত্রের দিকে তাকানো জরুরি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি সরকারি কেনাকাটা হয় দেশে। ২০২৫ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, শীর্ষ পাঁচ শতাংশ ঠিকাদার মোট প্রকল্পের ৬১ শতাংশ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, অথচ প্রায় ১০ শতাংশ ঠিকাদার মিলিতভাবে বাজারের এক শতাংশেরও কম অংশ পান। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বড় প্রকল্পগুলো সাধারণত যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে শীর্ষ ঠিকাদারদের হাতেই থেকে যায়, আর রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে এই আধিপত্যের ধরনও বদলে যায়।
এই বৈষম্যের প্রেক্ষাপটেই নতুন অধ্যাদেশকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, দুই দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ঠিকাদার প্রকৃতপক্ষে সুযোগবঞ্চিত ছিলেন, তাই তাদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরির যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে তার সতর্কবার্তা হলো, এই সংস্কারের আড়ালে যেন উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ ক্ষুণ্ন না হয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে যদি শুধু সুবিধাভোগীর তালিকা বদলে যায় আর প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো তৈরি না হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থে দেশের কোনো লাভ হবে না বলেই মনে করছেন তিনি। তবে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই অবশ্য অধ্যাদেশের কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের আশঙ্কা, সুযোগবঞ্চিতদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে গিয়ে পুরো ক্রয়প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একইভাবে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থানীয় অংশীদারত্বের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বা আনুকূল্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ।
সব মিলিয়ে নতুন এই অধ্যাদেশ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় একদিকে যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই সংস্কার আদৌ প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করবে, নাকি কেবল সুবিধাভোগীর তালিকায় পরিবর্তন আনবে।

