শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করে, রাখাইনের বুথিডং, মংডু ও রাথেডং এলাকায় সহিংসতা শুরুর আগে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। তাদের মধ্যে ২ লাখের বেশি ওই এলাকাগুলোতে থেকে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে চলে আসে বলে দাবি করেছে নেপিদো।
বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মিয়ানমারের এই দাবি নাকচ করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে রোহিঙ্গাদের তালিকা ও প্রত্যেক ব্যক্তিকে যাচাই করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেছে। তবে প্রায় নয় বছর পর মিয়ানমার অন্তত কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে—এটিকে তিনি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন।
যাচাই নিয়ে প্রশ্ন বাংলাদেশের
মিয়ানমারের বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশে থাকা মিয়ানমারের নাগরিকদের মধ্যে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করেছে।
মিয়ানমারের দাবি, যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত বলে দাবি করেছে দেশটি। আর ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে মিয়ানমার।
তবে এই যাচাই প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা ও পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ।
মিজানুর রহমানের মতে, মিয়ানমার হয়তো পুরোনো পারিবারিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যাচাই করেছে। ফলে তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ২০১৭ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুদের নাম মিয়ানমারের আগের জনসংখ্যার নথিতে থাকার কথা নয়।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। ২০১৭ সালে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার পর শিবিরগুলোতে জন্ম নেওয়া শিশুরাও এর মধ্যে রয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন শুরু হলে যাচাই করা ব্যক্তিরা নিজেদের আত্মীয়স্বজনের পরিচয়ও নিশ্চিত করতে পারবেন।
মিয়ানমারের বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের বারবার ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, মিয়ানমার কী পরিভাষা ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো মন্তব্য নেই।
রোহিঙ্গা সংকটের দায় নিয়ে ভিন্ন বয়ান
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনকে একপেশে ও ভুল তথ্যনির্ভর বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের বিষয়ে তারা নিজেদের ভাষ্য তুলে ধরতে চায়।
দেশটি আরও জানিয়েছে, যাচাই করা বাস্তুচ্যুতদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে স্বেচ্ছায় ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তবে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়ার পরই তারা যাচাই করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে।
মিয়ানমার একই সঙ্গে দাবি করেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন মূলত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটিকে উপস্থাপন করার বিষয়েও তারা আপত্তি জানিয়েছে।
মিয়ানমারের ভাষ্য অনুযায়ী, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ২০১৬ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালায় এবং তখনই বিপুলসংখ্যক মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
তবে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিয়ানমারের এই বক্তব্যের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে আসে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য
২০১৮ সালের আগস্টে প্রকাশিত জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। প্রতিবেদনে গণহত্যার উদ্দেশ্য থাকার যৌক্তিক ভিত্তিও পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল আরও নথিভুক্ত করেছিল, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগ চললেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কোনো রোহিঙ্গাকে তাদের নিজভূমি মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার ও বসবাসের নিশ্চয়তাসহ নানা প্রশ্নে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

