নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন শেষ হয়েছে। এই সময়ে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং রাজধানীর যানজট কমাতে বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হলেও অধিকাংশ উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের বদলে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর্যায়েই রয়েছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সড়ক, রেল ও নৌপথকে ঘিরে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে ছিল বৈদ্যুতিক বাস চালু, বাস রুট পুনর্বিন্যাস, নারীদের জন্য নির্দিষ্ট বাস, একীভূত সড়ক-রেল-নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাজধানীর চারটি বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াতের সময় কমানো এবং নিরাপদ নৌযান চালু করা।
তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এসব পরিকল্পনা নিয়ে একাধিক বৈঠক করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বিএনপি ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর যানজট ও পরিবহন পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় প্রতি মাসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এসব বৈঠকে যানজট নিরসন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, বাস রুট পুনর্বিন্যাস এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের অনেকগুলোই এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি, বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সরকারের ১৮০ দিনের বেশির ভাগ পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক প্রস্তুতি, সমীক্ষা কিংবা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
তবে সরকারের উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থায়।
রাজধানীর আট থেকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সংকেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ট্রাফিক সংকেত অমান্যকারী যানবাহন শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
একজন পরিবহন বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান সরকারের পরিবহন খাতে ঘোষিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। তবে অন্যান্য কিছু পরিকল্পনাতেও সীমিত অগ্রগতি হয়েছে।
পরিবহন খাতকে পরিবেশবান্ধব করতে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা করেছিল সরকার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের মাধ্যমে ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার জন্য ৮০০ কোটি টাকা ঋণের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
কিন্তু বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনায় আগ্রহী করে তোলা এখনো সম্ভব হয়নি। একইভাবে বিভিন্ন মালিকের বিভিন্ন ধরনের বাসকে একত্র করে নির্দিষ্ট রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিতে বাস চালুর পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
বাস রুট পুনর্বিন্যাসকে রাজধানীর যানজট কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও এ ক্ষেত্রেও এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
সড়ক, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত করে একটি বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে হালনাগাদ সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রাজধানীর কয়েকটি পথে এক রেলপথের প্রস্তাব এসেছে।
এসব পথে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় এক রেলপথকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মূল গণপরিবহনের সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহারের কথাও রয়েছে।
সড়ক পরিবহনের তুলনায় রেল খাতে কিছুটা দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের নতুন রেলপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রথমবারের মতো ঢাকা-গোপালগঞ্জ পথে অভিযাত্রী কমিউটার ট্রেন চালু করেছে।
এটি সরকারের ঘোষিত যাত্রীসেবা বাড়ানোর উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম বাস্তবায়িত পদক্ষেপ।
তবে পরিবহন খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মার্চ থেকে রাজধানীর যানজট নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়নি।
বাস রুট পুনর্বিন্যাস, বৈদ্যুতিক বাস কেনার জন্য ঋণ সুবিধা, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো এর উদাহরণ বলে মনে করছেন তারা।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের চিত্র তাই বলছে, পরিবহন খাতে পরিকল্পনার ঘাটতি নেই; বরং বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরিকল্পনাগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের গতি বাড়ানো না গেলে রাজধানীর যানজট, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপদ যাতায়াতের সংকট কাটাতে ঘোষিত উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

