ঢাকার মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ এমআরটি-৫ নর্দার্ন রুটের নির্মাণ ব্যয় প্রায় দ্বিগুণের পথে। ২০১৯ সালে অনুমোদিত ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি এখন ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৫১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা বা ১২৬ শতাংশ। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদিত ব্যয় নয়; সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা আরডিপিপিতে এই ব্যয় ধরা হয়েছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করেছে এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। মূল প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন ছিল ১২ হাজার ১২১ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীর ঋণসহ প্রকল্প সহায়তা ছিল ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাবে সরকারি অর্থায়ন দ্বিগুণ হয়ে ২৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা বেড়ে প্রায় ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
ব্যয় বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি সামনে এসেছে দরপত্রে। প্রকল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পাতাল অংশের দরপত্রে ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দাম আগের হিসাবকে অনেক পেছনে ফেলেছে। যেমন, প্যাকেজ-৫-এর জন্য মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। কিন্তু দরপত্রে সর্বনিম্ন দর আসে প্রায় ১১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা, মূল হিসাবের তিন গুণেরও বেশি। প্যাকেজ-৬ এর ক্ষেত্রেও মূল হিসাব ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা, পরামর্শকের হিসাব ৬ হাজার ১২৬ কোটি হলেও সর্বনিম্ন দর এসেছে ১৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
এখানেই প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে, কেন একই কাজের জন্য সরকারি প্রাথমিক হিসাব আর বাজারের দরপত্রের মধ্যে এত বড় পার্থক্য? ডিএমটিসিএল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়া, দেশি-বিদেশি মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং পাতাল রেল নির্মাণের ঝুঁকি, সব মিলিয়ে ঠিকাদারদের দর বেড়েছে। এর সঙ্গে দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞরা সামনে এনেছেন। এর আগে এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ নর্দার্নের কয়েকটি প্যাকেজে অনুমোদিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি দর আসার কারণে দরপত্র প্রক্রিয়া থমকে ছিল।
ডলারের দাম বৃদ্ধিও বাংলাদেশের জন্য এই প্রকল্পকে আরও ব্যয়বহুল করেছে। মূল প্রকল্প তৈরির সময় প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরে হিসাব করা হয়েছিল। নতুন হিসাবের ক্ষেত্রে ৩০ জুলাই ২০২৬-এর বাংলাদেশ ব্যাংকের হার অনুযায়ী প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্প অনুমোদনের সময়ের তুলনায় টাকার হিসাবে ডলারের দাম প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। মেট্রোরেলের ট্রেন, রেল ও বৈদ্যুতিক-যান্ত্রিক সরঞ্জাম, পরামর্শক সেবা এবং বিভিন্ন আমদানি-নির্ভর খরচ ডলারে হওয়ায় বিনিময় হারের এই পরিবর্তন সরাসরি প্রকল্প ব্যয়ে চাপ তৈরি করছে।
তবে শুধু দাম বেড়েছে বলেই পুরো বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। প্রকল্পের অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং ঠিকাদার বাছাইয়ের পদ্ধতিতে কতটা প্রতিযোগিতা রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এমআরটি-৫ নর্দার্ন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আগে ডিএমটিসিএল জানিয়েছিল, জাইকার অর্থায়ন ও পরামর্শক নিয়োগের কাঠামোর কারণে কিছু দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে কাগজে দরপত্র আন্তর্জাতিক হলেও বাস্তবে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম থাকলে বাজারদর যাচাইয়ের সুযোগও কমে যায়।
ব্যয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের সময়ও বাড়ছে। মূল পরিকল্পনায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হেমায়েতপুর-ভাটারা রুটটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। ডিএমটিসিএলের বর্তমান তথ্যেও এখনো ২০২৮ সালের সমাপ্তির সময়সীমা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে এবং যাত্রী চলাচল শুরুর লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০৩৩ সালের জানুয়ারি। অর্থাৎ ব্যয় বাড়ার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ও কয়েক বছর পিছিয়ে যাচ্ছে।
এমআরটি-৫ নর্দার্ন রুটের গুরুত্ব অবশ্য কম নয়। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এই পথে ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়াল অংশ থাকবে। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল ও ৫টি উড়াল। হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২ ও ভাটারার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে এই রুট যুক্ত হবে।
তাই এখন আসল প্রশ্ন শুধু মেট্রোরেলটি কত দ্রুত নির্মাণ করা যাবে, তা নয়, ৯৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত ব্যয়টি কতটা যৌক্তিক এবং ভবিষ্যতে সেটি আরও বাড়বে কি না। প্রকল্পের খরচের বড় অংশ যদি উচ্চ দরপত্র, সীমিত প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকির কারণে বাড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক তুলনা ও স্বচ্ছ ব্যয় যাচাই জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হবে সরকারি অর্থ ও উন্নয়ন ঋণের মাধ্যমে অর্থাৎ এর আর্থিক চাপ পড়বে রাষ্ট্রের ওপরই। ঢাকার যানজট কমানোর জন্য মেট্রোরেল প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কম খরচে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে এবং বাস্তবসম্মত হিসাবের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

