প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে আলোচনা চললেও সফরের আগে সম্পর্কের পরিবেশ অনুকূল করার ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে অগ্রগতি চায় ঢাকা।
রোববার (১৬ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। তবে সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য ও মতবিনিময়ের ঘটনা এই প্রক্রিয়ায় নতুন করে জটিলতা তৈরি করেছে।
সফরের আগে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চায় ঢাকা
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, শুধু আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ বা কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকলেই সফরের জন্য যথেষ্ট পরিবেশ তৈরি হয় না। দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।
শহীদুল করিম বলেন, বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। সরকারের দৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এ লক্ষ্যে শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এর অর্থ হলো, ঢাকা সফরটিকে কেবল সৌজন্য বা আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হিসেবে দেখছে না। বরং প্রত্যর্পণসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে ভারতের অবস্থানকে সফরের সামগ্রিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণই বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি এখন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে ফেরত আনার জন্য বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।
ঢাকার বক্তব্য, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় এ বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ফলে এ ইস্যুতে দিল্লির অবস্থান ঢাকার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি করেছে। ঢাকার দৃষ্টিতে এমন পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদেরও ফেরত চায় ঢাকা
শেখ হাসিনার পাশাপাশি শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন ও অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণের বিষয়টিও সামনে এনেছে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী অভিযুক্তদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা উচিত। এ বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
এই দাবির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বোঝাতে চাইছে, প্রত্যর্পণের বিষয়টি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের নিরাপত্তা, বিচারিক সহযোগিতা এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতা কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ঢাকার অবস্থান
ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির মূল অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে। মুখপাত্র বলেন, সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ঢাকা একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও কার্যকর রাখতে চাচ্ছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট রাখতে চাইছে। অর্থাৎ সম্পর্ক উন্নয়নের দরজা খোলা থাকলেও একতরফা ছাড় দেওয়ার অবস্থানে যেতে চায় না বাংলাদেশ।
ব্রিকস সম্মেলনেও আমন্ত্রণ
আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
ফলে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পর সেই সফর নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ায় আবারও দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সফর হলে কী বার্তা যাবে?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত ভারত সফরে গেলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে। একইভাবে সফরটি পিছিয়ে গেলে বা স্থগিত হলে সেটিও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখা হতে পারে।
এ মুহূর্তে তাই মূল প্রশ্ন শুধু প্রধানমন্ত্রী ভারত যাবেন কি না—তা নয়। বরং সফরের আগে ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদের ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকার বর্তমান অবস্থান থেকে অন্তত এটুকু পরিষ্কার—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ আগ্রহী, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে পারস্পরিক সম্মান, জাতীয় স্বার্থ এবং বাস্তব সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিতে চায়। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পথ কতটা মসৃণ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে দিল্লির পদক্ষেপের ওপর।

