বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, এই সফরের জন্য আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন।
ঢাকায় রোববার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এ কথা জানান।
এর আগে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো আভাস দিয়েছিল, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন তারেক রহমান। ঢাকায় বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বলেন, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে ভারতের কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদেরও বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভারতের লোকসভার স্পিকার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তাঁকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
ভারতের পক্ষ থেকে আরও একটি আমন্ত্রণ রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতের পর এসব আমন্ত্রণের কথা জানিয়েছিলেন। তবে সে সময় তিনি বলেছিলেন, এসব বিষয়ে বাংলাদেশ তখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এর মধ্যেই দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে কর্তৃপক্ষের সূত্রের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লি সফরে যেতে পারেন।
দুপুরে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ‘উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে’।
তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে যেভাবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং মনে করে, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
মি. করিম বলেন, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে আবারও বলা হয়, সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশ তার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি অব্যাহত রাখবে।

তবে মি. করিম এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি। ফলে তাঁর ভাষায় দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলমান থাকার পরও কেন এখন প্রধানমন্ত্রীর সফর হচ্ছে না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
পরে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। সব মিলিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যায়।
এর মধ্যেই দুই সরকারের মধ্যে অস্বস্তির বড় কারণ হয়ে ওঠে দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনের এক দিন আগেই শেখ হাসিনা যাতে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারতের সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ।

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব বা এফসিসি সাউথ এশিয়া ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনের পরপরই শেখ হাসিনা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার দিন রাতে কঠোর ভাষায় একটি বিবৃতি দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা ও তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দিল্লিকে অনুরোধ করার কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে ভারত বারবার বলেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত ১০ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটি ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।
বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ‘খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে’। তিনি জানান, তাঁরা এখন সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন।

তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে তিনি বলেন, ভারতের আমন্ত্রণ আগে থেকেই রয়েছে এবং ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী এ সফরের জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, দুই নেতা একসঙ্গে বসলে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। তাঁর মতে, গণতন্ত্রে ইস্যু থাকবেই। বাংলাদেশের যেমন ইস্যু থাকবে, ভারতেরও থাকবে। তবে দুই দেশের মানুষের অভিন্ন চাওয়া হলো ভালো সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’-এর ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
ওই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এর ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে গুঞ্জন আরও জোরালো হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন।
ঢাকার বিবৃতিতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের বিষয়টি সেই অনুকূল পরিবেশ তৈরির অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছিলেন, তারেক রহমানের দিল্লি সফরের প্রস্তুতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক ফিরিয়ে এনে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।
এখন ঢাকার পক্ষ থেকে অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলার পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ দুটি নির্দিষ্ট দাবি সামনে আসায় দিল্লি কী প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিই এখন দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

