চা শিল্পের দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলা, বাগান মালিকদের ঋণ পরিশোধে সুবিধা দেওয়া এবং নতুন ঋণের সুযোগ সহজ করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং ভূমি, অর্থ, বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কমিটিতে রয়েছেন।
বাণিজ্যসচিবকে কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা সমিতির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ চা ব্যবসায়ী সমিতির চেয়ারম্যানসহ চা খাতের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষকেও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চা বাগানগুলোর বিদ্যমান ঋণের চাপ কমানো কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে বাগান মালিকদের খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে সুপারিশ করবে কমিটি। একই সঙ্গে চা বাগানগুলোকে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও মতামত দেবে তারা।
চা শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে অর্থসংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ রয়েছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়া বাগানগুলোর জন্য বিদ্যমান ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ তৈরি হলে তাদের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ঋণের সুযোগ তৈরি হলে উৎপাদন ও বাগান পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা সহজ হবে।
চা খাতের জন্য ৬ শতাংশ সুদে একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠনের বিষয়েও মতামত দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে। এই ধরনের তহবিল চালু করা গেলে সংকটে থাকা বাগানগুলো তুলনামূলক কম সুদে অর্থ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে তহবিলের আকার, অর্থের উৎস এবং ঋণ বিতরণের শর্ত কী হবে, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এর পাশাপাশি চাকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা যায় কি না, সে বিষয়েও কমিটিকে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। চা উৎপাদন মূলত কৃষিনির্ভর হলেও এর উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের ধরন অন্যান্য কৃষিপণ্যের তুলনায় আলাদা। ফলে কৃষিপণ্যের স্বীকৃতি পেলে চা খাত কী ধরনের নীতিগত ও আর্থিক সুবিধা পেতে পারে, সেটিও কমিটির বিবেচনায় আসবে।
চা বাগানের অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখবে কমিটি। বড় চা বাগানগুলোতে অনেক জমি বিভিন্ন কারণে অব্যবহৃত থাকে। এসব জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে একদিকে বাগানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
কমিটিকে এসব বিষয়ে মতামত ও সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কমিটিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী কমিটি প্রয়োজনমতো বৈঠক করতে পারবে।
চা শিল্পের বর্তমান সংকট শুধু বাগান মালিকদের আর্থিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন ব্যয়, ঋণের চাপ, বাজার পরিস্থিতি এবং বাগান পরিচালনার ব্যয়— সব মিলিয়ে খাতটির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারের নতুন উদ্যোগের মূল পরীক্ষা হবে শুধু কমিটি গঠনে নয়, বরং তাদের সুপারিশ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং সেগুলো চা বাগানগুলোর বাস্তব সমস্যার কতটা সমাধান করতে পারে, তার ওপর।
প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গেই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।

