বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে গত ৯ থেকে ১৫ আগস্ট এক সপ্তাহে ১৩০টি খাদ্যস্থাপনা পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জরিমানা প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। প্রশ্নটা এখানেই, খাদ্য নিরাপত্তার মতো সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত অপরাধে এই জরিমানা কি ব্যবসায়ীদের জন্য যথেষ্ট শাস্তি, নাকি এটি কেবল নিয়ম না মানার একটি ছোটখাটো খরচ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
১৩০ প্রতিষ্ঠানে অভিযান, ব্যবস্থা সাতটিতে
৯ থেকে ১৫ আগস্টের অভিযানে ঢাকা মহানগরের সাতটি প্রতিষ্ঠানসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার, ঢাকা ও মানিকগঞ্জের আরও চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। সব মিলিয়ে সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান এবং খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ১৩০টি খাদ্যস্থাপনা মনিটরিং করা হয়েছে।
সংখ্যাটা শুনলে অভিযানকে বড় মনে হতে পারে। কিন্তু ১৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটির বিরুদ্ধে মামলা, অর্থাৎ প্রায় ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা আরও একটি বিষয় সামনে আনে। এই অভিযানে যেসব অনিয়ম ধরা পড়েছে, সেগুলোর মধ্যে কতগুলো শুধু সতর্ক করার মতো এবং কতগুলো এমন, যেগুলো ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ, সেই তথ্য প্রকাশ করা হলে অভিযানের কার্যকারিতা আরও পরিষ্কার হতো।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। জরিমানার অঙ্ক দেখেই পুরো আইনকে দুর্বল বলা ঠিক হবে না। কারণ নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থায় জরিমানা একটি মাত্র ব্যবস্থা; অপরাধের ধরন অনুযায়ী মামলা, কারাদণ্ড, খাদ্য জব্দ বা ধ্বংসসহ আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিএফএসএ-র অধীনে সারা দেশে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতও রয়েছে।
কোন আইনে জরিমানা হয়?
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান আইনি কাঠামো তৈরি করেছে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩। খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটি এই আইনের আওতায় পড়ে। এসব বিষয় তদারকি ও আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ধরা পড়লেই সবার জন্য একই অঙ্কের জরিমানা—বিষয়টি এমন নয়। কী ধরনের অপরাধ হয়েছে, সেটি কোন ধারার আওতায় পড়ে এবং অপরাধটি কতটা গুরুতর—তার ওপর শাস্তির ধরন ও মাত্রা নির্ভর করে। আইনে বিভিন্ন অপরাধের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান রয়েছে এবং একই ধরনের অপরাধ পুনরায় করলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধ হলে সংশ্লিষ্ট মালিক, পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা কর্মকর্তার দায়ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিবেচনায় আসতে পারে।
এখানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্য বিক্রির মতো অপরাধ এই আইনের আওতায়ও আসতে পারে। যেমন, ভেজাল খাদ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ধারা ৪১ এবং খাদ্যে নিষিদ্ধ ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর ক্ষেত্রে ধারা ৪২-এ কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে শুধু “কত টাকা জরিমানা হয়েছে” দেখলেই পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না; কোন আইনে, কোন ধারায় এবং কী ধরনের অপরাধের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—সেটিও দেখতে হবে।
তাহলে ১০ লাখ টাকা কি খুব কম?
এখানে সরল উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ জরিমানার যথেষ্টতা নির্ভর করে অপরাধের ধরন, প্রতিষ্ঠানের আকার, অনিয়মের মাত্রা, ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অপরাধটি ইচ্ছাকৃত না অবহেলার ফল এসব বিষয়ের ওপর।
কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, একটি বড় খাদ্য ব্যবসার মাসিক বিক্রি কয়েক কোটি টাকা। সেখানে এক লাখ টাকা জরিমানা যদি ব্যবসার মোট আয়ের তুলনায় খুব ছোট হয়, তাহলে সেটি নিয়ম ভাঙার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি নাও করতে পারে। তখন একজন ব্যবসায়ী হিসাব করতে পারেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মানসম্মত কাঁচামাল ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে যে বাড়তি খরচ হবে, তার চেয়ে নিয়ম ভেঙে ধরা পড়ার জরিমানা কম।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই হিসাবটাই বিপজ্জনক। কারণ এখানে ক্ষতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; দূষিত বা অনিরাপদ খাবার বাজারে পৌঁছে গেলে সেই ঝুঁকির বহর অনেক বড় হতে পারে। তাই কার্যকর আইন প্রয়োগের লক্ষ্য শুধু জরিমানা আদায় নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে নিয়ম না মানার অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে নিয়ম ভাঙার ঝুঁকি ও খরচ বেশি হয়।
জরিমানার পাশাপাশি আরও কঠোর ব্যবস্থা আছে
নিরাপদ খাদ্য আইনে শুধু অর্থদণ্ডের ওপর নির্ভর করা হয়নি। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে খাদ্য আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনটির বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির মাত্রা ভিন্ন এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি বাড়ানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
এ ছাড়া কোনো খাদ্য মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, অনুপযোগী, দূষিত বা ভেজাল বলে প্রমাণিত হলে ম্যাজিস্ট্রেট সেটি জব্দ করে ধ্বংস করার নির্দেশ দিতে পারেন। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় জরিমানার অঙ্ক নয়; পণ্য জব্দ, ধ্বংস, মামলা এবং ব্যবসার ওপর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও বড় বিষয় হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, খাদ্য আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জরিমানা হলে আইনের ৬২ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী নির্দিষ্ট শর্তে আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ প্রণোদনা হিসেবে পেতে পারেন; বিএফএসএও জানিয়েছে, সরাসরি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে অভিযোগ বা মামলা করার সুযোগ রয়েছে।
আসল সমস্যা জরিমানার অঙ্ক, নাকি ধরা পড়ার সম্ভাবনা?
এখানে একটু থামা দরকার। খাদ্য ব্যবসায়ীর আচরণ শুধু জরিমানার পরিমাণ দিয়ে বদলায় না। বরং তিনটি বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম কতটা পরিষ্কার, নিয়ম ভাঙলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটা এবং ধরা পড়ার পর শাস্তি কতটা নিশ্চিত।
একটি প্রতিষ্ঠান যদি জানে যে বছরে একবার অভিযান হতে পারে এবং অনিয়ম ধরা পড়লেও তুলনামূলক ছোট জরিমানা দিয়ে বিষয়টি শেষ করা সম্ভব, তাহলে বড় জরিমানা থাকলেও তার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিপরীতে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন, পুনরাবৃত্ত অপরাধে কঠোর ব্যবস্থা, পণ্য জব্দ এবং প্রয়োজন হলে আদালতে মামলা এসব একসঙ্গে কাজ করলে আইন অনেক বেশি কার্যকর হয়।
বিএফএসএ-র নিজের আইনি কাঠামোতেও শুধু অভিযান নয়, খাদ্যের নমুনা গ্রহণ ও পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
এক সপ্তাহে সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নিঃসন্দেহে তদারকির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। কিন্তু নিরাপদ খাদ্যের সাফল্য মাপার আসল সূচক শুধু বছরে কত টাকা জরিমানা আদায় হলো, তা নয়। বরং একই প্রতিষ্ঠান বা একই ধরনের ব্যবসায় বারবার একই অনিয়ম হচ্ছে কি না, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজার থেকে সরানো হচ্ছে কি না এবং নিয়ম ভাঙার পর প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে তাদের ব্যবস্থাপনা বদলাচ্ছে কি না সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শেষ পর্যন্ত ভোক্তা জরিমানার টাকা খায় না, খাবার খায়। তাই কোনো অনিয়মের পর সরকারি কোষাগারে ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা জমা পড়লেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যদি একই ধরনের অনিরাপদ খাবার আবার বাজারে ফিরে আসে, তাহলে সেই জরিমানা কার্যত সমস্যার সমাধান নয় বরং সমস্যার একটি মূল্য মাত্র।
বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপ তাই আরও বেশি অভিযান নয়, আরও কার্যকর অভিযান। অর্থাৎ কোন প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি বেশি, কোন অপরাধ গুরুতর, কে বারবার একই কাজ করছে এবং কোথায় কঠোর শাস্তি দরকার এই তথ্যভিত্তিক পদ্ধতিই জরিমানাকে সত্যিকারের প্রতিরোধ।

