দেশ যখন প্রতি রাতে লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড দেখছে, তখন রাজনীতির মঞ্চে যা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত একটা তর্ক—কে বেশি দায়িত্বশীল, কার হাতে সমাধান আছে, আর কার নেই।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সমাধানের পরিকল্পনা দিতে বলেছেন। বিরোধী দল পাল্টা জবাবে পনেরো দফা প্রস্তাবের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলেছে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে। এই বাগ্যুদ্ধ দেখতে জমজমাট, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হওয়ার মতো উপকরণে ভরপুর। কিন্তু এই তর্কটাকে মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করলে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়ানো যায় না—দুই পক্ষ আসলে কোন লড়াইটা লড়ছে? সংকটের সমাধানের লড়াই, নাকি দায় এড়ানোর লড়াই? এই তর্কের আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা প্রকাশ্য বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এবং অনেক বেশি অস্বস্তিকর।
সেই বাস্তবতা হলো, জ্বালানি খাতের সবচেয়ে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপগুলো সংসদে হয় না, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে হয় না, এমনকি মন্ত্রিসভার বৈঠকেও হয় না। সেগুলো ঠিক হয় রাজস্ব বোর্ডের এক আদেশে, বন্দরের শুল্ক নির্ধারণী নিয়মে, কিংবা কোনো এক মন্ত্রণালয়ের টেবিলে বছরের পর বছর পড়ে থাকা একটা ফাইলে। এসব জায়গায় কেউ ভোট চায় না, কেউ ক্ষমা চায় না, আর দুঃখ প্রকাশেরও প্রয়োজন পড়ে না। অথচ দেশের মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ থাকবে কি না, কারখানার চাকা ঘুরবে কি না, তার আসল ফয়সালা হয় সেখানেই।
এই সম্পাদকীয়র উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলের কাউকে পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড় করানো নয়। বরং একটা প্রশ্ন তোলা—যে রাজনৈতিক তর্ক আমরা প্রতিদিন দেখছি, তা কি আসল সমস্যার ধারেকাছেও পৌঁছাচ্ছে?
যখন সংখ্যাই সব বলে দেয়
৩ আগস্ট রাত একটায় সারা দেশে লোডশেডিং দাঁড়ায় ৩,৫১২ মেগাওয়াটে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। মাত্র দিন কয়েকের মধ্যে, ৯ আগস্ট, সেই রেকর্ড আরও দুইবার ভাঙে—বিকেলে ৩,৬৭১ মেগাওয়াট, রাতে ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট। তুলনার জন্য বলা দরকার, আওয়ামী লীগ আমলে সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড হয়েছিল ২০২৩ সালের জুনে, ৩,৪১৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ যে সরকার ক্ষমতায় এসেছিল আগের সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনরোষের ঢেউয়ে, সেই সরকারের আমলেই এখন লোডশেডিংয়ের সর্বকালের রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। এই তথ্যটুকু কোনো রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, নিছক পরিসংখ্যান। কিন্তু এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, সংকট কতটা গভীর।
সংকটের পেছনে যে কারণগুলো সাধারণত আলোচিত হয়, সেগুলো মূলত দুর্ঘটনাজনিত। জুলাইয়ে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর দৈনিক প্রায় ষাট কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ একধাক্কায় বন্ধ হয়ে যায়, যার পুরোপুরি পুনরুদ্ধার এখনো হয়নি। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ন্যূনতম সক্ষমতায় চালাতে যে গ্যাস দরকার, তার সিংহভাগই মিলছে না। একই সময়ে ভারতের ঝাড়খণ্ডে বন্যায় কয়লা ভিজে যাওয়ায় আদানির কেন্দ্র থেকে প্রতিশ্রুত বিদ্যুৎ-এর একটা বড় অংশ আসছে না, আর দেশীয় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উৎপাদনেও ব্যাঘাত ঘটেছে। এই দুই কারণ সত্যিকার অর্থেই দুর্ঘটনা—কারো সিদ্ধান্তহীনতার ফল নয়।
কিন্তু তৃতীয় একটা কারণ আছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চে প্রায় কেউই কথা বলছে না, অথচ বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এটাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও এই মুহূর্তে চলছে মাত্র দুই হাজার মেগাওয়াটের মতো। এখানে কোনো জাহাজ পোড়েনি, কোনো কয়লা ভেজেনি। তেল পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা ব্যয়বহুল, আর সেই ব্যয় মেটাতে দরকার ডলার। অর্থাৎ সংকটের এই তৃতীয় অংশটা দুর্ঘটনা নয়, সিদ্ধান্তের ফসল—এবং সিদ্ধান্তের ফসল বলেই এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্ভব, দায় নির্ধারণ করা সম্ভব। প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা বসে আছে শুধু একটা প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায়—চড়া দামে জ্বালানি কিনতে সরকার কত টাকা ঢালতে রাজি। এই একটা প্রশ্নেই আসলে লুকিয়ে আছে গোটা সংকটের রাজনৈতিক অর্থনীতি।
দুই ঘোষণা, দুই পরিণতি
এই বাস্তবতার পটভূমিতে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাগ্বিতণ্ডাকে যাচাই করলে একটা আশ্চর্যজনক মিল ধরা পড়ে। সরকার এবং বিরোধী দল—দুই পক্ষই মূলত একই ধরনের দুটি প্রস্তাবের কথা বলছে, যেগুলো ইতিমধ্যে সরকারিভাবে ঘোষিতও হয়ে গেছে। অথচ বাস্তবায়নের প্রশ্নে দুটোই আটকে আছে, এবং আটকে থাকার জায়গাটা প্রায় অভিন্ন।
প্রথমটা সৌরবিদ্যুৎ। জুন মাসে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা দেন, সৌর খাতের মূল যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম কর—সবকিছু শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। এই ঘোষণা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে দুই মাস পরে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যখন একই দাবি তোলা হয়, তখন তা বাস্তবে সরকারেরই আগের সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি মাত্র। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। বাজেট ঘোষণার পর রাজস্ব বোর্ডের পরবর্তী আদেশে সৌর ইনভার্টারের সামগ্রিক করভার দাঁড়িয়েছে সতেরো শতাংশে। আর বন্দরে পণ্য ছাড় করাতে গিয়ে আমদানিকারকদের গুনতে হচ্ছে আরও বেশি—প্রায় আটত্রিশ শতাংশ। কারণ কাস্টমস প্যানেলের মূল্য নির্ধারণ করছে প্রকৃত ক্রয়মূল্যের বদলে ওজন হিসেবে, যার ফলে পঞ্চাশ ডলারে কেনা প্যানেলের কাগুজে মূল্য দাঁড়াচ্ছে একশো দশ ডলারে। লিথিয়াম ব্যাটারির ওপর করভার তো আরও বেশি, প্রায় বাষট্টি শতাংশ। যে শিল্প কারখানা আগে এক শতাংশ শুল্কে সৌর যন্ত্রপাতি আনতে পারত, এখন তাদের গুনতে হচ্ছে সতেরো গুণ বেশি। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠন একাধিক ফোরামে এই অসংগতির কথা তুলে ধরেছে, কিন্তু সরকারের তরফে না এসেছে কোনো ব্যাখ্যা, না এসেছে সংশোধনের উদ্যোগ।
দ্বিতীয় উদাহরণটা বিদ্যুৎ। বিরোধী দলের তরফে যে দাবি সবচেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে উঠেছে, তা হলো মার্চেন্ট পাওয়ার নীতির বাস্তবায়ন—অর্থাৎ দেশি বেসরকারি উৎপাদকদের সরাসরি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ দেওয়া, যেখানে দাম ঠিক করবে ক্রেতা-বিক্রেতা নিজেরাই, সরকারের বাড়তি ব্যয়ের প্রয়োজন পড়বে না। এই নীতি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের অক্টোবরে। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য যে একটামাত্র বিষয় বাকি—সরকারি গ্রিডের তার ব্যবহারের মাশুল নির্ধারণ—তা আজও চূড়ান্ত হয়নি। দশ মাস পেরিয়ে গেছে একটা সংখ্যা নির্ধারণের অপেক্ষায়। বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী সংগঠন, এমনকি নীতিনির্ধারণী গোলটেবিলেও এই বিলম্বের কথা বারবার উঠে এসেছে, কিন্তু ফাইল নড়েনি।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, দুটো ক্ষেত্রেই মূল সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে প্রকাশ্যে, রাষ্ট্রীয় সিলমোহর সহকারে—একটা সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা, আরেকটা সরকারি গেজেট। অথচ দুটোকেই কার্যত অকেজো করে দিয়েছে এমন কিছু কাগজ, যেখানে কারও নাম নেই, কারও স্বাক্ষর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। শূন্য থেকে সতেরো, সতেরো থেকে আটত্রিশ—এই পরিবর্তনগুলো কে করল, তার জবাবদিহি নেই। মাশুলের ফাইল কার টেবিলে আটকে আছে, তারও উত্তর নেই।
রাজনীতির ভাষা আর প্রশাসনের বাস্তবতা
এখানেই মূল সমস্যাটা দৃশ্যমান হয়। রাজনৈতিক নেতারা যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে সংকটের সমাধানকে দেখানো হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি আর পরিকল্পনার প্রশ্ন হিসেবে—যেন যথেষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই তিন-ছয় মাসে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সরকারের নিজস্ব মন্ত্রীরাই স্বীকার করেছেন, নতুন অবকাঠামো তৈরিতে অন্তত দুই বছর লাগবে। এমনকি অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ছয় মাস কিংবা এক বছরে সমাধান সম্ভব নয়। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তার নিজের মন্ত্রিসভার ভেতর থেকেই এসেছে তার বিপরীত বার্তা।
এই বৈপরীত্যটা নিছক অসতর্কতা নয়। এটা দেখায়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আর প্রশাসনিক বাস্তবতা—দুটো ভিন্ন জগতে চলছে, আর এই দুই জগতের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সময় বেঁধে দিচ্ছেন সংসদের ভাষায়, অথচ তার নিজের মন্ত্রণালয়ের বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। বিরোধী দল সরকারের ঘোষণাকে খণ্ডন করছে পাল্টা ঘোষণা দিয়ে, অথচ যে জায়গায় আসল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে—কাস্টমসের আদেশ, বন্দরের মূল্য নির্ধারণী নিয়ম, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনহীন ফাইল—সেই জায়গার কথা কোনো পক্ষই তুলছে না।
বণ্টনের প্রশ্ন, যা কেউ তুলছে না
সংকটের আরেকটা দিক আছে, যা রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায় অনুপস্থিত—বরাদ্দের প্রশ্ন। যে সামান্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ এখন সরবরাহযোগ্য আছে, তা কোথায় যাবে, কার আগে বরাদ্দ পাবে, এই সিদ্ধান্ত আসলে প্রতিদিনই নেওয়া হচ্ছে—শুধু প্রকাশ্য ঘোষণা ছাড়া। একটা এলাকার সরবরাহ কমিয়ে আরেকটা এলাকায় পাঠানো হচ্ছে, হাজার হাজার নতুন গ্যাস সংযোগের আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে আছে, টাকা জমা নেওয়া হলেও সংযোগ মেলেনি। এসবই বণ্টনগত সিদ্ধান্ত, কিন্তু কেউ তার দায় নিচ্ছে না, কারণ এসব সিদ্ধান্তে সইয়ের প্রয়োজন পড়ে না, ভোটের মুখোমুখি হতে হয় না।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বারবার বলছেন, সরকারকে এখন কঠিন একটা বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে—সবাইকে সবসময় বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব নয়, এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে, আর কোন খাত কখন বিদ্যুৎ পাবে না, তা আগে থেকে জানিয়ে দিতে হবে, যাতে অন্তত অনিশ্চয়তা কমে। অথচ রাজনৈতিক মঞ্চে এই প্রশ্নের চিহ্নমাত্র নেই। প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জেও নেই, বিরোধী দলের পনেরো দফাতেও অগ্রাধিকারের বিস্তারিত রূপরেখা নেই। কারণটা বোধগম্য—শুল্কের আদেশ পরিবর্তন করলে সাধারণ মানুষ টের পায় না, কিন্তু কার সংযোগ আগে কাটা যাবে, তার তালিকা প্রকাশ্যে করলে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়।
নিরপেক্ষতার প্রশ্নে কিছু কথা
এই বিশ্লেষণে কিছু বিষয় স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ-এর শুল্ক শূন্য করার ঘোষণাটি যে আন্তরিকভাবেই দেওয়া হয়েছিল, তা ধরে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে—বাজেটে সৌর উৎপাদনের কর অব্যাহতি ও বিলে রেয়াতের সুবিধা এখনো বহাল রয়েছে। শুল্কসংক্রান্ত হিসাবগুলো এসেছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের নিজস্ব বিশ্লেষণ থেকে, যাদের সদস্যরাই শুল্ক কমলে সরাসরি লাভবান হবেন। একইভাবে মার্চেন্ট পাওয়ারে সম্ভাব্য হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ-এর হিসাবও ব্যবসায়ীদেরই দাবি, কোনো নিরপেক্ষ সংস্থার নিরীক্ষা নয়। এই তথ্যসূত্রগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্টতা মাথায় রেখেই সেগুলো বিবেচনা করা উচিত। তবে দশ মাস ধরে একটা ফাইল আটকে থাকার তথ্যটি একাধিক স্বতন্ত্র সূত্রে সমর্থিত, আর সেটাই মূল বিষয়।
আরেকটা বিষয় স্বীকার করা দরকার—বিরোধী দলের নিজস্ব অবস্থানেও সংগতির ঘাটতি আছে। একদিকে তাদের দাবিপত্রে তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ বন্ধ রেখে সবার সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ বেচাকেনার নীতি অবিলম্বে চালুর দাবি তোলা হয়েছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় স্পষ্ট নয়। এছাড়া মার্চেন্ট পাওয়ার নীতি বাস্তবায়িত হলে সংকটকালে কে আগে বিদ্যুৎ পাবে, সেই বিবেচনায় সুবিধা মূলত বড় শিল্পের দিকেই যায়—এই বাস্তবতাও স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন।
দায়হীনতার একটা কাঠামো
এই পুরো চিত্রটাকে একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, সমস্যাটা কোনো একজন মন্ত্রী বা একটা মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নয়। এটা একটা কাঠামোগত প্রবণতা। যেখানে সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে, রাজনৈতিক মূল্য দিয়ে নিতে হয়—যেমন সংসদে দাঁড়িয়ে শুল্ক শূন্য করার ঘোষণা, বা গেজেটে বেসরকারি বিদ্যুৎ বিক্রির নীতি—সেখানে ঘোষণা আসে দ্রুত, স্পষ্ট ভাষায়, জনসমক্ষে। কিন্তু সেই ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজ যখন যায় প্রশাসনিক স্তরে, যেখানে জবাবদিহিতা প্রায় অদৃশ্য, সেখানে গতি থমকে যায়। এই দুই স্তরের মধ্যে ফারাকটাই আসল সংকট। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঘোষণা দিয়ে দায় সেরে ফেলছেন, আর বাস্তবায়নের দায়িত্ব চলে যাচ্ছে এমন একটা স্তরে, যেখানে কারও নাম জড়ানোর ঝুঁকি নেই, কারও জবাবদিহি করতে হয় না। ফলাফল হলো, ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে একটা স্থায়ী ফাঁক তৈরি হয়ে যায়, যা কেউ পূরণ করার দায়িত্ব নেয় না।
এই কাঠামোগত সমস্যাটা রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের সঙ্গে বদলায় না, কারণ এটা কোনো নির্দিষ্ট দলের চরিত্র নয়—এটা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার গঠনগত বৈশিষ্ট্য। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, রাজস্ব বোর্ডের আদেশ লেখার পদ্ধতি একই থাকে, বন্দরের মূল্য নির্ধারণী নিয়ম একই থাকে, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দীর্ঘসূত্রতাও একই থাকে। তাই প্রশ্নটা কেবল এই সরকার বা এই বিরোধী দলের সততা নিয়ে নয়—প্রশ্নটা এই কাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়ে। যতক্ষণ না প্রশাসনিক স্তরের সিদ্ধান্তগুলোও প্রকাশ্য জবাবদিহিতার আওতায় আসছে—কে কবে কী আদেশ দিলেন, কেন দিলেন, তার নথি সহজলভ্য হচ্ছে—ততক্ষণ যেকোনো সরকারের যেকোনো ভালো ঘোষণাই এই একই পথে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
শেষ কথা
মহেশখালীর অগ্নিকাণ্ডের স্বাধীন প্রযুক্তিগত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি—এই একটামাত্র বিষয়ে বিরোধী দলের দাবি সবচেয়ে সরল ও প্রশ্নাতীত বলা যায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে অন্তত এটুকু স্পষ্ট হবে, সংকটের সূচনা নিছক দুর্ঘটনা, নাকি রক্ষণাবেক্ষণের গাফিলতি।
কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নটা থেকেই যায়। শনিবারের মাঠে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরিকল্পনা থাকলে সংসদে আনুন। বিরোধী দল বলছে, বিশেষ অধিবেশন ডাকুন। দুই পক্ষই সংসদের দিকে আঙুল তুলছে, অথচ প্রকৃত সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে এমন সব জায়গায়, যেখানে অধিবেশনের প্রয়োজনই পড়ে না। রাজস্ব বোর্ডের একটা আদেশ সংসদে ঘোষিত শূন্য শুল্ককে সতেরোতে রূপান্তরিত করে রেখেছে। বন্দরের একটা মূল্য নির্ধারণী নিয়ম পঞ্চাশ ডলারের যন্ত্রাংশকে একশো দশ ডলার ধরে শুল্ক আদায় করছে। একটা মাশুল নির্ধারণী ফাইল দশ মাস ধরে কোনো টেবিলে পড়ে আছে। এসবের কোনোটার জন্যই ভোট লাগেনি, বাজেট বরাদ্দ লাগেনি, এমনকি দীর্ঘ সময়ও লাগেনি।
আসন্ন শীতে সরকারকে যে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে, তার প্রকৃতিও একই রকম—ব্যয়বহুল জ্বালানি কিনতে কত টাকা ব্যয় করা হবে, আর যেটুকু গ্যাস অবশিষ্ট আছে, তা কোন চুলা বা কোন কারখানায় পৌঁছাবে। এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে ঠিক সেসব ঘরেই, যেখানে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ কিংবা পনেরো দফা কোনোটাই পৌঁছায় না।
তিন মাস আর ছয় মাসের সময়সীমা নিয়ে রাজনৈতিক তর্ক চলতেই পারে, চলা উচিতও—গণতান্ত্রিক পরিসরে জবাবদিহিতার এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রকৃত সময় মাপা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ঘড়িতে—বন্দরের ইয়ার্ডে, রাজস্ব বোর্ডের দপ্তরে, আর মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত না হওয়া একটা ফাইলে। যতক্ষণ না রাজনৈতিক আলোচনা এই ঘড়ির দিকে দৃষ্টি ফেরায়, ততক্ষণ সংসদের বিতর্ক আর মাঠের বক্তৃতা যতই তীব্র হোক না কেন, তা দেশের অন্ধকার দূর করার প্রশ্নে খুব বেশি অর্থবহ হবে না। জনগণের প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা নয়—প্রয়োজন সেই নাম-না-জানা ফাইলগুলোর জবাবদিহিতা, যেখানে দেশের প্রকৃত জ্বালানি-ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে। রাজনীতি যতক্ষণ মঞ্চে কথা বলবে আর প্রশাসন নীরবে ফাইল সরাবে, ততক্ষণ প্রশ্নটা একই থেকে যাবে—চ্যালেঞ্জ কার কাছে, আর জবাব কোথায়?

