দেশের রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। পুরনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভেঙে দুটি পৃথক ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। নতুন কাঠামোয় একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করবে রাজস্ব নীতি নিয়ে, অন্যটি সামলাবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এই ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাজস্ব নীতি বিভাগ কাজ করবে সরকারের নীতিনির্ধারণী মস্তিষ্ক হিসেবে— একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো তৈরিই হবে এর মূল কাজ। অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ হবে বাস্তবায়নকারী দল, যাদের মূল দায়িত্ব থাকবে প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের কাজে। তার ভাষায়, করদাতাদের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য, আর নীতিনির্ধারণে অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাত, গবেষক এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়েনি। এই ব্যবধান কমাতে শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর করের বোঝা বাড়ানো সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বরং করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি রোধ এবং অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের সম্মতি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
চলতি অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী হলেও তা ইচ্ছাকৃতভাবেই নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী, কারণ সরকার ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে উন্নয়নের অর্থায়ন মূলত নিজস্ব সম্পদ থেকেই করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারে তিনটি মূল বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি— আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারিত্ব। এর মধ্যে সম্পূর্ণ অটোমেশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাদের সরাসরি কর কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার প্রচলিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যায়। সরকারের লক্ষ্য একটি সম্পূর্ণ যোগাযোগবিহীন ও মুখোমুখি সাক্ষাৎ ছাড়াই পরিচালিত ডিজিটাল রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ই-ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা, আধুনিক কাস্টমস সফটওয়্যার, জাতীয় সিঙ্গেল উইন্ডো এবং উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তির মতো একাধিক ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ চালু করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, এই রাজস্ব সম্মেলন কেবল হিসাব-নিকাশের অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি জাতীয় ঐকমত্য গঠনের মঞ্চ, যেখানে নিজস্ব অর্থায়নে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথরেখা নির্ধারণ করা হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি বড় কাঠামোগত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী— তা হলো অস্বাভাবিক রকম কম কর-জিডিপি অনুপাত। সাম্প্রতিক অর্থবছরে এই অনুপাত সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশে, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় সাড়ে ১৯ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের অবস্থান তার চেয়ে অনেক পেছনে, মাত্র সাত শতাংশের কিছু বেশি।
অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে নতুন দুটি সংস্থা তৈরি করলেই রাজস্ব খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এই সংস্কার কতটা সফল হবে তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং নীতি ও প্রশাসনিক শাখার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। বিশেষত করের আওতা সম্প্রসারণ ও অটোমেশন বাস্তবায়নে বাস্তবিক অগ্রগতি দেখা না গেলে, ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

