চিঠির ব্যবহার দিন দিন কমে আসার মধ্যেই নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছে দেশের ডাক বিভাগ। সরকারি খরচ কমিয়ে মাঠপর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি ও লেটার রাইটার মডিউল’ নামে একটি নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিক পরিকল্পনায় দেশের ১২টি স্থানে এই সেবা চালুর কথা থাকলেও এর মধ্যেই ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনায় কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই মূলত এই উদ্যোগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্যে, শুরুতে সারা দেশে ১২টি ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে তিনটি শহরে ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে। এই তালিকায় শিগগিরই যুক্त হতে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকা বান্দরবান এবং হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেখানে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম শুরু হবে। ধারাবাহিকভাবে এই সেবা উপজেলা পর্যায় থেকে গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত জুলাই মাসের শেষদিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এই সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রথম পর্যায়ে রাজধানীর ভেতরে চারটি এবং রাজধানীর বাইরে চারটি—মোট আটটি ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর মধ্য দিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পের পরিচালক জানিয়েছেন, ডাকসেবার প্রক্রিয়া টেকসই ও আধুনিক করার লক্ষ্যে পরিচালিত একটি প্রকল্পের অধীনে পাইলট ভিত্তিতে এই মডিউল চালু করা হয়েছে। এটি পূর্ণ পরিসরে বাস্তবায়িত হলে তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা হয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে, যার ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার মোবাইল সেট এবং পাঁচশ কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে, পাশাপাশি তিনটি প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ডাক বিভাগ মোট আটটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার একটি হলো এই ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস কার্যক্রম। মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের ফলে মৌসুমি ফলমূল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগের সক্ষমতা আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ কেজি ওজনের ফলের ক্রেট-সহ বিভিন্ন পণ্য দেশের কোনো জেলায় পাঠাতে সময় লাগছে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা, আর প্রত্যন্ত উপজেলা এলাকায় এই সময়সীমা ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সীমিত রাখা সম্ভব হচ্ছে—এবং তাও কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই।
পার্সেল ট্র্যাকিং সুবিধা নিয়ে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, আগে কোনো পণ্য পরিবহনের সময় কোথায় আছে, তা জানার কোনো উপায় ছিল না। এখন প্রতিটি পার্সেলে বারকোড যুক্ত করে একটি ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ইস্যু ও বিতরণ করা হচ্ছে, ফলে গ্রাহকেরা ঘরে বসেই তাদের পণ্যের সর্বশেষ অবস্থান জানতে পারছেন।
সরকারি সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে ডাক বিভাগ। এর মধ্যে রয়েছে ভূমির দলিল, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সেবা। একই সঙ্গে অনলাইনে কেনা পণ্যের ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধা চালুর প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে, এবং বিদেশে পার্সেল পাঠানোর জন্য স্বল্প খরচে একটি দ্রুতগামী মেইল সেবাও চালু রয়েছে।
ডাক বিভাগের কার্যক্রমে এই বদলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহাপরিচালক বলেন, চিঠি ও পার্সেলজাতীয় ডাকদ্রব্য গ্রহণ, পরিবহন ও বিতরণ করাই ডাক বিভাগের মূল কাজ। এর বাইরে সঞ্চয় সেবা পরিচালনা, পাঠ্যবই ও টিকা বিতরণ বা লটারির টিকিট বিক্রির মতো কাজগুলো আসলে সরকারের পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে দেওয়া বাড়তি দায়িত্ব।
ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক চিঠি কমে যাওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ভিডিও কল ও খুদে বার্তার মাধ্যমে মানুষ এখন তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করতে পারায় চিঠির উত্তরের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সরকারি অফিসগুলোও এখন কাগজের বদলে ডিজিটাল নথি ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হচ্ছে, যার ফলে দাপ্তরিক চিঠিপত্রের প্রচলনও কমে আসছে।
তবে চিঠির প্রচলন কমলেও এতে হতাশ নন মহাপরিচালক। বরং তিনি মনে করছেন, ই-কমার্সের বিকাশের হাত ধরে ডাক বিভাগের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাচ্ছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, মানুষ অনলাইনে যত পণ্য কেনাবেচা করেন, তার প্রতিটিই এক অর্থে ডাকদ্রব্য। চিঠির জায়গা এখন দখল করে নিচ্ছে পার্সেল ও পণ্য পরিবহন, এবং এই মূল কাজকে সামনে রেখেই নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।
উল্লেখ্য, এই উদ্যোগের কাঠামোয় দুটি ভিন্ন পথ রাখা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের নাম ও ব্র্যান্ড ব্যবহার করে চুক্তির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট এলাকায় পণ্য সংগ্রহ ও বিতরণের কাজ করলে তা পরিচালিত হবে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ হিসেবে, আর কোনো ব্যক্তি এককভাবে এই দায়িত্ব নিলে তিনি পরিচিত হবেন ‘লেটার রাইটার’ নামে। এই দ্বিমুখী কাঠামোর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি—দুই পর্যায়েই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

