বাংলাদেশের পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে বড় বাধা হয়ে আছে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা সতর্কতা। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা নিয়ে একাধিক দেশ এখনো তাদের নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ভ্রমণ না করতে পরামর্শ দিচ্ছে।
দেশভেদে এসব সতর্কতার মাত্রা ও কারণ আলাদা হলেও দীর্ঘদিন ধরে এমন নির্দেশনা চলতে থাকায় আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কম থাকায় দেশের পর্যটন ব্যবসা অনেকটাই অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
পর্যটন ব্যবসায়ী, ভ্রমণ আয়োজক ও এজেন্সিগুলোর মতে, নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ কাটানো না গেলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নতুন করে তুলে ধরা কঠিন হবে।
পর্যটন খাতের বিশেষজ্ঞ ও প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখার মহাসচিব তৌফিক রহমান মনে করেন, সরকারের উদ্যোগের ঘাটতির কারণেই অনেক দেশের ভ্রমণ সতর্কতা দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছে।
তাঁর মতে, শুধু বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারকে সতর্কতা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো যথেষ্ট নয়। যেসব দেশ ভ্রমণ সতর্কতা দিয়েছে, সেসব দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের নিয়মিত বৈঠক করা প্রয়োজন। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁদের বিস্তারিত জানানো হলে তাঁরা নিজ নিজ সরকারকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিতে পারবেন।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের উপপরিচালক মহিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরিবর্তনের পর বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা কমানো বা প্রত্যাহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৩০ জুলাই ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নিয়ে তাদের সামগ্রিক ভ্রমণ সতর্কতা তৃতীয় স্তর থেকে দ্বিতীয় স্তরে নামিয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় সতর্কতার মাত্রা কমিয়ে এখন বাংলাদেশ ভ্রমণে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সতর্কতার আওতায় রয়েছে। এসব এলাকায় অস্থিরতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও অপহরণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জাপানের অবস্থান তুলনামূলকভাবে নরম। দেশটি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। দেশের বাকি অংশে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। এই নির্দেশনা ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর রয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের সতর্কতা তুলনামূলকভাবে কঠোর। দেশটি বাংলাদেশকে তৃতীয় স্তরে রেখে প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অপহরণ, সশস্ত্র ডাকাতি এবং রাজনৈতিক ও জাতিগত সহিংসতার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছে।
কানাডা পুরো বাংলাদেশে উচ্চমাত্রার সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। সম্ভাব্য বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও দেশব্যাপী ধর্মঘটের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে দেশটি এমন নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে সব ধরনের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ রয়েছে। কানাডার এই নির্দেশনা সর্বশেষ ২৩ জুন ২০২৬ হালনাগাদ করা হয়।
অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশ নিয়ে আগের তুলনায় সতর্কতার মাত্রা কমিয়েছে। বর্তমানে দেশটি পুরো বাংলাদেশে উচ্চমাত্রার সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছে। তবে অপহরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষের আশঙ্কায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে। ২৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত এই নির্দেশনা কার্যকর ছিল।
যুক্তরাজ্য পুরো বাংলাদেশে ভ্রমণ নিষেধ করেনি। তবে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।
ফ্রান্সের সতর্কতা তুলনামূলকভাবে কঠোর। দেশটি সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশকে বিস্তৃতভাবে এমন একটি শ্রেণিতে রেখেছে, যেখানে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হয়। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকা ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে আরও কঠোর সতর্কতার আওতায় রাখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাতের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা মানচিত্র সর্বশেষ ৬ মার্চ ২০২৬ হালনাগাদ করা হয়।
জার্মানির পররাষ্ট্র দপ্তরও ৩১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ নিয়ে নিরাপত্তা ও ভ্রমণসংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। এতে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে ভ্রমণকারীদের সতর্ক করা হয়েছে।
ডেনমার্ক বাংলাদেশজুড়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি সংঘর্ষ ও অপহরণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা ২৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে সরাসরি ‘২০টি দেশ বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতা দিয়েছে’—এমন বক্তব্য দেওয়া পুরোপুরি সঠিক হবে না। কারণ বিভিন্ন দেশের সতর্কতার ধরন, মাত্রা ও নির্দিষ্ট এলাকার ক্ষেত্রে নির্দেশনা এক নয়।
পর্যটন ব্যবসাতেও পড়ছে চাপ
দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কম থাকায় এর প্রভাব পড়েছে ভ্রমণ এজেন্সিগুলোর ওপরও। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, কেউ কার্যক্রম সীমিত করেছে, আবার কেউ ছোট পরিসরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান আগে বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণের ওপর নির্ভর করত, তাদের কর্মী রাখা, প্রচারণা চালানো এবং পরিচালন ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা আরও প্রকট, কারণ দীর্ঘ সময় ব্যবসা মন্দা থাকলে তা সামাল দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা তাদের কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলো নিয়ে বিদ্যমান ভ্রমণ সতর্কতা কমানো গেলে বিদেশি পর্যটক ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আয়োজকদের আস্থা ফিরতে পারে। তবে শুধু সতর্কতা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিলেই হবে না। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদার, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, পর্যটকদের জন্য বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থা, জরুরি সেবা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু বিদেশি পর্যটকদের বোঝানো নয় যে দেশটি সুন্দর ও আকর্ষণীয়। একই সঙ্গে তাদের নিজ নিজ সরকারকেও বোঝাতে হবে—বাংলাদেশে ভ্রমণ নিরাপদ, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য।
দেশের পর্যটন খাত যখন ক্রমেই অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তখন আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। বিদেশি পর্যটক ফিরলে ভ্রমণ এজেন্সিগুলোর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও শক্তিশালী হতে পারে।

