গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগারে যে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল, তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ওই সময় সারা দেশের কারাগার থেকে মোট দুই হাজার ২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে গিয়েছিলেন। প্রায় এক বছর পার হলেও তাদের মধ্যে ৬৯০ জনের কোনো হদিস মেলেনি। এর মধ্যেও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই পলাতকদের মধ্যে ১৬৬ জনের পরিচয় সম্পর্কেই কোনো তথ্য নেই কারা কর্তৃপক্ষের কাছে।
মঙ্গলবার পুরান ঢাকার বকশিবাজারে কারা অধিদপ্তর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
তিনি জানান, পরিচয়হীন ওই ১৬৬ জন পালিয়েছিলেন নরসিংদী কারাগার থেকে। ওই কারাগারে হামলার সময় নথিপত্র ও সার্ভার পুড়ে বা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বন্দিদের সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষিত নেই। নরসিংদী কারাগার থেকে মোট পালিয়েছিলেন ৮২৬ জন, যা দেশের অন্য যেকোনো কারাগারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। বাকিদের বিষয়ে তথ্য পেতে আদালতের সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
জঙ্গি প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগার থেকে পালানো তালিকাভুক্ত ৯ জন জঙ্গির মধ্যে ছয়জনকে ইতিমধ্যে পুনরায় আটক করা হয়েছে। এদের একজন, যিনি এলাকায় ‘ওস্তাদ’ নামে পরিচিত, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সম্প্রতি পুলিশের হাতে ফের গ্রেপ্তার হন। তবে এখনো তিনজন জঙ্গি অধরা রয়ে গেছেন। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গে এই পলাতক জঙ্গিদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি স্বীকার করেন, এ নিয়ে কর্তৃপক্ষও কিছুটা উদ্বিগ্ন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আলোচনায় উঠে আসে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ওই জঙ্গির সঙ্গে এখনো পলাতক আরেক শীর্ষ জঙ্গির কারাগারে অবস্থানকালে যোগাযোগ হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন স্বীকার করেন, ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, কারণ দেশের কারাগারগুলোর প্রকৃত ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা বহুগুণ বেশি। একই ওয়ার্ড বা ভবনে অবস্থানের সুযোগে বিভিন্ন বন্দির মধ্যে যোগাযোগ ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে এখন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিদের পর্যবেক্ষণে রেখে আলাদা জোনে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কারাগারের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে সরাসরি প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন কোনো রাখঢাক না রেখে বলেন, কারাগারে মোবাইল ফোনের ব্যবহার একেবারে বন্ধ—এই নিশ্চয়তা তিনি শতভাগ দিতে পারছেন না। তবে গত এক বছরে বিভিন্ন অভিযানে তিন হাজারের বেশি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। শুরুর দিকে এই সংখ্যা অনেক বেশি থাকলেও এখন তা ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে তার দাবি।
চিকিৎসাসেবা প্রসঙ্গে উঠে আসে জনবল সংকটের চিত্র। দেশের কারাগারগুলোতে মোট ১৫১টি চিকিৎসক পদ থাকলেও বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক নিয়মিতভাবে কর্মরত আছেন। অন্য কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে, তবে তারা অন্যত্র কর্মরত থাকায় পূর্ণ সময় দিতে পারছেন না, যার ফলে সেবায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
বন্দি সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে আইজি প্রিজন জানান, স্বাভাবিক সময়ে দেশের কারাগারে গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বন্দি থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজারে, যেখানে মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৫ হাজার। প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৮০০ জনের কাছাকাছি বন্দি কারাগারে প্রবেশ করছেন এবং প্রায় তিন হাজার জন বেরিয়ে যাচ্ছেন—এই আসা-যাওয়ার হিসাবেই প্রকৃত বন্দি সংখ্যা নির্ধারিত হয় বলে জানান তিনি। এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্তদের সংখ্যা বৃদ্ধিকে। জুন থেকে জুলাই—এই দুই মাসে মোবাইল কোর্টে ২৬ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে অল্প মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে, যাদের কারও সাজা একদিন, কারও এক মাস বা তিন মাস পর্যন্ত। এই প্রবণতা কারাগারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে সরকারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিদেশি বন্দিদের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন আইজি প্রিজন। বর্তমানে দেশের কারাগারে মোট ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি আছেন, যাদের মধ্যে ১৭০ জনের সাজার মেয়াদ শেষ হলেও নিজ দেশে ফেরার প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে তাদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চলছে।
মৃত বিদেশি বন্দিদের মরদেহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও একটি স্পর্শকাতর চিত্র উঠে আসে। গত দুই বছরে প্রায় ১৭ জন বিদেশি বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে মাত্র দুটি মরদেহ সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে। বাকিদের মরদেহ এখনো দেশে সংরক্ষিত রয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণত তিন মাস পর মরদেহ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে পরিবার বা দেশ থেকে কেউ মরদেহ নিতে না এলে পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। বর্তমানে এমন তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে।
সব মিলিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসা তথ্য থেকে স্পষ্ট, দেশের কারা ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বন্দির চাপ সামলাচ্ছে, তেমনি জনবল সংকট, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও পলাতক বন্দিদের অসম্পূর্ণ তথ্যের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জও একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

