নারায়ণগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ১০ জনকে হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের কীভাবে শনাক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে সাক্ষী সম্রাট হোসেনকে জেরা করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। নেতাকর্মীদের আলাদা কোনো পোশাক ছিল কি না, জানতে চাইলে সাক্ষী জানান, আলাদা পোশাক ছিল না; তাদের মাথায় হেলমেট ছিল।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ জেরা অনুষ্ঠিত হয়। মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ মোট ১২ জন আসামি রয়েছেন।
এদিন মামলার তৃতীয় সাক্ষী সম্রাট হোসেন তার আগের জবানবন্দির বাকি অংশ উপস্থাপন করেন। তিনি সরকারি গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত।
সাক্ষ্যের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন সম্রাট। তার দাবি, ওই সময় তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে তিনি আহত হন। তার চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি ও পিলেটের আঘাত লাগে।
সম্রাটের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে তার ডান চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই এবং বাঁ চোখেও সমস্যা রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে এখনো ৪০টির বেশি পিলেট রয়েছে বলেও তিনি আদালতকে জানান।
জবানবন্দি শেষে পলাতক অয়ন ওসমানসহ চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আমির হোসেন সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন। শুরুতেই তিনি সম্রাটের দৃষ্টিশক্তি ও আসামিদের শনাক্ত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জেরার এক পর্যায়ে আইনজীবী দাবি করেন, সম্রাট গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা নন এবং ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা গেজেটও তার নিজের তৈরি। রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার জন্য তিনি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন আইনজীবী।
এর জবাবে সম্রাট বলেন, তিনি গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা এবং ওই গেজেট তার নিজের তৈরি নয়। আদালতে তিনি সত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও দাবি করেন।
এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের শনাক্ত করার বিষয়টি সামনে আনেন। তাদের গায়ে কোনো আলাদা পোশাক ছিল কি না, জানতে চাওয়া হলে সম্রাট জানান, আলাদা কোনো পোশাক ছিল না। তবে তাদের মাথায় হেলমেট ছিল।
আইনজীবী তখন প্রশ্ন তোলেন, হেলমেট পরা থাকলে কীভাবে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হলো। জবাবে সম্রাট বলেন, যাদের নাম তিনি সাক্ষ্যে উল্লেখ করেছেন, তাদের তিনি আগে থেকেই চিনতেন। কারণ তিনি অয়ন ওসমানদের বাসার পাশের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন।
পরে সম্রাটকে জেরা করেন পলাতক অন্য আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আলী হায়দার ও মুসতাভী হাসান রাতুল।
এর আগে গত ১২ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন সম্রাট হোসেন। মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মঙ্গলবার শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদসহ অন্যরা।
মামলায় শামীম ওসমান ছাড়া অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন তার ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের সাবেক সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি রাজু আহমেদ, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন সাজনু, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ ও সোহানুর রহমান শুভ্র।
মামলায় আনা অভিযোগের সত্যতা এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়নি। সাক্ষীদের জবানবন্দি ও আসামিপক্ষের জেরার পর উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

