দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়নে বড় পরিসরে হাত দিচ্ছে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির জন্য পাঁচটি নতুন ভবন তৈরির লক্ষ্যে প্রায় ১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আজ বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনে সকালে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। শুধু ঢাকা মেডিকেলের ভবন প্রকল্পই নয়, একই সভায় মোট ১১টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে, যেগুলোর সম্মিলিত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০ হাজার ৪৬ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেলের ক্যাম্পাসে তিনটি ১৫ তলা ভবন এবং দুটি ৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে একটি ১৫ তলা ভবন ব্যবহৃত হবে শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য, অন্য একটিতে গড়ে উঠবে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হোস্টেল, আর তৃতীয় ভবনটি হবে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান। বাকি দুটি ৪ তলা ভবনও ব্যবহৃত হবে আবাসন-সংক্রান্ত প্রয়োজনে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আর এর বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রকল্পটির পেছনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০২৫ সালের মে মাসে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রস্তাবটি প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। তবে সে সময় এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ছয় মাস পর প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেকের তালিকায় স্থান পেল।
নতুন ভবনগুলো ঠিক কোথায় নির্মিত হবে, তা নিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হাসপাতালের সড়কঘেঁষা এবং মর্গের কাছাকাছি এলাকায় থাকা পুরোনো টিনশেড স্থাপনা ভেঙে সেখানেই নতুন ভবন তোলা হবে। বর্তমানে এই জায়গায় শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক কোয়ার্টার রয়েছে।
এই বিশাল বিনিয়োগের পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মেডিকেল কলেজের বহু ভবন এখন বেশ পুরোনো ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেড় হাজারের মতো শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়নরত, অথচ প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। একই সমস্যায় ভুগছেন ইন্টার্নশিপ করা তরুণ চিকিৎসকেরাও, যাঁদের জন্যও উপযুক্ত থাকার জায়গা প্রয়োজন। এসব সংকট বিবেচনায় নিয়েই একটি সামগ্রিক মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল, যার ভিত্তিতেই বর্তমান প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে।
ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, একটি ১৫ তলা আবাসিক ভবন ও একটি হোস্টেল ভবন তৈরিতে খরচ হবে প্রায় ২৯৯ কোটি টাকা। এর বাইরে আরেকটি ১৫ তলা ভবন এবং দুটি ৪ তলা ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৭৭ কোটি টাকা। এসব ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপনেই খরচ হবে আরও প্রায় ১১৮ কোটি টাকা।
শুধু এই একটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয় সরকারের পরিকল্পনা। একই একনেক সভায় দেশের ১০টি মেডিকেল কলেজে মোট ১৯টি হোস্টেল নির্মাণের জন্য পৃথক আরেকটি প্রকল্প তোলা হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মেডিকেলেও অতিরিক্ত দুটি ছাত্রী হোস্টেল নির্মিত হবে, যা নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কিছুটা হলেও কমাতে সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের বাইরে আজকের একনেক সভায় আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। নৌপরিবহন খাতে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জন্য দুটি প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার জাহাজ কেনার লক্ষ্যে প্রায় ১ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প রয়েছে তালিকায়। সড়ক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে সেতুগুলোর জন্য স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রায় ১১৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হবে।
পানিসম্পদ খাতেও একাধিক প্রকল্প রয়েছে আলোচনায়। লালমনিরহাট সদর উপজেলায় ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন ঠেকাতে ব্যয় হবে প্রায় ২৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট এলাকা থেকে কুমিরা ঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫৯ কোটি টাকা। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও নদী সংরক্ষণের লক্ষ্যে তুরাগ নদ রক্ষা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে খরচ হবে প্রায় ৫৬৭ কোটি টাকা।
গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকছে। গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণের জন্য প্রায় ৪ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের তালিকায় রয়েছে, যা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও মজবুত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এসবের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী, জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী এবং রাজধানীর ডেসকো এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীও আজকের সভায় অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আজকের একনেক সভাকে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি, নৌপরিবহন ও পানিসম্পদ—এই পাঁচ খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় আট দশকের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের আবাসন সংকট অনেকটাই লাঘব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

