বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের দাবিতে চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছেন ইত্যাদি জিন্স লিমিটেডের শ্রমিকেরা। বুধবার সকালে মূল সড়কে অবস্থান নেওয়ায় ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা বকেয়া রয়েছে। দ্রুত পাওনা পরিশোধ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিকদের বিক্ষোভের মূল কারণ বকেয়া বেতন এবং অন্যান্য দাবি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যায়। শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানিয়েছেন, শ্রমিক ও কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ আপাতত পরিস্থিতি আলোচনার মাধ্যমে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আতুরার ডিপো চট্টগ্রামের পুরোনো পোশাকশিল্প এলাকাগুলোর একটি। সরকারি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইত্যাদি জিন্স লিমিটেড নামে নিবন্ধিত কারখানাটির ঠিকানা পশ্চিম ষোলশহর, আতুরার ডিপো এবং প্রতিষ্ঠানটি তৈরি পোশাক খাতের একটি কারখানা। সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত শ্রমিকসংখ্যা ২ হাজারের বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে কয়েক মাসের বেতন বা ভাতা আটকে গেলে বিষয়টি শুধু শ্রমিকদের ব্যক্তিগত আর্থিক সংকট নয়, বড় একটি কর্মীসমষ্টির জীবনযাত্রায় সরাসরি চাপ তৈরি করতে পারে।
বেতন আটকে যাওয়ার প্রভাবও অন্য যেকোনো ব্যবসায়িক পাওনার চেয়ে আলাদা। একজন কারখানা মালিকের জন্য বেতন একটি পরিচালন ব্যয় হলেও একজন শ্রমিকের জন্য সেটিই পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচের প্রধান উৎস। ফলে বেতন পরিশোধে বিলম্ব যত দীর্ঘ হয়, শ্রমিকদের ওপর আর্থিক চাপ তত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপই অনেক সময় কারখানার ভেতরের অসন্তোষকে রাস্তায় নিয়ে আসে।
তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষের অর্থনৈতিক প্রভাবও ছোট নয়। একটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হলে শুধু ওই দিনের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠানোর সময়, কারখানার নগদ প্রবাহ এবং পরবর্তী অর্ডার পাওয়ার সক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য নির্ধারিত লিড টাইম মেনে পণ্য সরবরাহ করা পোশাক ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তাই শ্রমিকের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা শুধু শ্রমিককল্যাণের বিষয় নয়, কারখানার ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতারও অংশ।
চট্টগ্রামে এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইত্যাদি জিন্সের কয়েক শ শ্রমিক মাসের পর মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে আতুরার ডিপোর সড়ক অবরোধ করেছিলেন। সে সময় শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মালিকপক্ষের আশ্বাসের পর শ্রমিকেরা অবরোধ তুলে নেন। এক বছর না যেতেই একই কারখানার শ্রমিকদের আবার বকেয়া পাওনার দাবিতে সড়কে নামার ঘটনা তাই শুধু তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এই খাতের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে যেমন উৎপাদন খরচ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি, তেমনি কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শ্রমিক অসন্তোষ বাড়তে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কারখানার ভাবমূর্তি ও ক্রেতাদের আস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে প্রতিটি শ্রমিক বিক্ষোভকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে এর মূল কারণটি আড়ালে থেকে যায়। এখানে প্রশ্ন হলো কারখানার নগদ প্রবাহে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে, কেন শ্রমিকদের পাওনা সময়মতো দেওয়া হয়নি এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের যোগাযোগব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে স্থায়ী সমাধান না হলে আজকের বকেয়া বেতনের বিক্ষোভ আগামী দিনে আরও বড় শ্রম অসন্তোষে রূপ নিতে পারে।
এখন তাই আতুরার ডিপোর সড়ক স্বাভাবিক হওয়াই শেষ কথা নয়। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ভাতা দ্রুত পরিশোধ, মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা এবং ভবিষ্যতে পাওনা আটকে না যাওয়ার একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করাই হবে আসল সমাধান। কারণ একটি পোশাক কারখানার উৎপাদন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই উৎপাদনের পেছনে থাকা শ্রমিকের সময়মতো মজুরি পাওয়াও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

