প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে কোনো তাড়াহুড়ো নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্যমতে, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, কূটনৈতিক পর্যায়ে যথাযথ আলোচনা এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ প্রস্তাব—এসবের ভিত্তিতেই কেবল উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তিনি জানান, আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের রাজধানীতে অনুষ্ঠিতব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোটের শীর্ষ সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে প্রতিবেশী দেশের গণমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ এই মুহূর্তে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে কোনো তাড়াহুড়ো করার নীতি অনুসরণ করছে না। তবে দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হলে আসন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গত সপ্তাহে রাজধানীর একটি সরকারি বাসভবনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব মন্তব্য করেন। আলাপচারিতায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটের নতুন সমীকরণ, বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার পুনরায় খোলার সম্ভাবনা এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারভিত্তিক অগ্রগতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রতিবেশী দেশের গণমাধ্যমে প্রচারিত সফর সংক্রান্ত খবরগুলোকে নিছক জল্পনা বলে অভিহিত করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তাঁর মতে, এসব প্রতিবেদন অনুমাননির্ভর এবং বাস্তব ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের কোনো সফর হবে কি না, তা মূলত নির্ভর করছে প্রতিবেশী দেশের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে কি না তার ওপর। দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিবেশী দেশকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ জনগণের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকারের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ঠিক কী ধরনের সম্পর্কের কাঠামো গড়তে আগ্রহী, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে কোনো শীর্ষ সফরের যৌক্তিকতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে উভয় পক্ষের সম্মতি এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ ছাড়া আসন্ন সম্মেলনের আগেই সফর হওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই ক্ষীণ বলে তিনি জানান।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তিদের প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যম কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্যে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর পলাতক সাবেক শাসককে প্রতিবেশী দেশে রাজনৈতিক বা সংবাদমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়া গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, প্রতিবেশী দেশের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশবিরোধী যেকোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে সুযোগ দেওয়ার ঘটনা দেশের সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী এমন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়েও তা সমর্থনযোগ্য নয়। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান, এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের যেকোনো তৎপরতা রুখতে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
দেশের স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখছে বর্তমান সরকার। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, একটি উপসাগরীয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের আমন্ত্রণে গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট দেশ সফর চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী আরেকটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় জোটের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার কথা জানান উপদেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে কৃষিপণ্য আমদানি এবং উড়োজাহাজ ক্রয় সংক্রান্ত আলোচনা এগিয়ে চলার পাশাপাশি সামগ্রিক বাণিজ্য পরিমাণ বাড়ানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি। ইউরোপীয় জোটের সঙ্গে বাণিজ্য ও অংশীদারত্ব সংক্রান্ত একটি চুক্তির সুনির্দিষ্ট আলোচনাও শুরু হয়েছে।
প্রাচ্যের একটি বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভূরাজনৈতিক নানা চাপ এড়িয়ে একটি ব্যাপক অংশীদারত্ব কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি নিয়েও জোরালো আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসী সম্প্রদায় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতেও বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি বাড়তে থাকা আস্থার প্রমাণ হিসেবে উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনে আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সব দেশই বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়েছে। এই সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে শিগগিরই উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল আফ্রিকা সফরে যাবে, যেখানে চুক্তিভিত্তিক কৃষি সহযোগিতা এবং বাংলাদেশি পণ্যের নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির লক্ষ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা একটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশের শ্রমবাজার নিয়েও সুখবর দেন উপদেষ্টা। দুই দেশের সরকারপ্রধানের ইতিবাচক মনোভাব ও সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সুবাদে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটতে শুরু করেছে বলে তিনি জানান। শিগগিরই জটিলতার অবসান ঘটিয়ে এই দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ খুলে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্যকে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির স্বীকৃতি বলে অভিহিত করেন উপদেষ্টা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে একটি নীতিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রতিবেশী মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক ও আর্থিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা আরও জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিগত ছয় মাসে একটি সুদৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে, যা প্রমাণ করে একটি গণতান্ত্রিক সরকার কত দ্রুত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রীর এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কূটনৈতিক দক্ষতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। সিলেট অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই কূটনীতিক যুক্তরাজ্যে বেড়ে উঠেছেন এবং সেখানকার স্বনামধন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি যুক্তরাজ্যের তিনজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যার মধ্যে একজনের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

