তীব্র গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের ঘাটতিতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানার মধ্যে ছয়টিই এখন উৎপাদনের বাইরে। সচল রয়েছে শুধু ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা। এমন পরিস্থিতিতে সামনে আমন মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সার আমদানিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে বর্তমানে সারের সংকট নেই। আমন মৌসুমের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত সার রয়েছে এবং চলতি মাসেই আরও সার আমদানি হয়ে দেশে পৌঁছাবে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীনে থাকা বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি, যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি, ট্রিপল সুপার ফসফেট, ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি এবং শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি। একমাত্র ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানাতেই বর্তমানে উৎপাদন চলছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, সাতটি কারখানার মধ্যে ছয়টি বন্ধ থাকলেও শাহজালাল সার কারখানা দু-এক দিনের মধ্যে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে। কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ অবস্থায় নয়, বরং উৎপাদন স্থগিত রয়েছে। তাঁর দাবি, আমন মৌসুমে সারের ঘাটতি হবে না।
তিনি জানান, কাতার ও সৌদি আরব থেকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে সার আনা হচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়া ও ব্রুনেই থেকেও সার আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের সাতটি কারখানার সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন। এর মধ্যে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি দৈনিক ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু গ্যাসের সংকটে গত ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, আগামী মাসের প্রথম দিকে এটি চালু হতে পারে।
যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানিও গত ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। এর আগে তিন মাস উৎপাদনে থাকার পর প্রায় এক বছর বন্ধ ছিল কারখানাটি। এখানে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
আশুগঞ্জ সার কারখানাও একই কারণে গত বছরের ১ মার্চ থেকে উৎপাদনের বাইরে। প্রতিদিন এখানে প্রায় ১ হাজার ১০০ টন সার উৎপাদন করা সম্ভব। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানাটিতে প্রতি মাসে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
গ্যাসের পাশাপাশি কাঁচামালের সংকটও সার উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের নভেম্বর থেকে ট্রিপল সুপার ফসফেট কারখানার উৎপাদন বন্ধ। কারখানাটিতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টন টিএসপি সার উৎপাদন করা সম্ভব। তবে কবে আবার উৎপাদন শুরু হবে, তা নিশ্চিত নয়।
ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানির উৎপাদনও গত ২৮ জুন থেকে বন্ধ। কারখানাটিতে গ্যাসের প্রয়োজন না হলেও ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন থেমে আছে।
অন্যদিকে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। দৈনিক ১ হাজার ৩০০ টন উৎপাদন সক্ষমতার এই কারখানাটি দ্রুত চালু করার আশা করছেন কর্মকর্তারা।
বর্তমানে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর মধ্যে শুধু ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় উৎপাদন চলছে। কারখানাটিতে প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ টনের বেশি সার উৎপাদিত হচ্ছে।
তবে দেশের মোট চাহিদার তুলনায় এই উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে সামনে রবি মৌসুমকে ঘিরে সারের চাহিদা আরও বাড়বে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া মজুত রয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন। অথচ আসছে রবি মৌসুমে প্রয়োজন হবে ১৩ লাখ ২৬ হাজার টন।
ডিএপি সারের মজুত ৩ লাখ ৫২ হাজার টন, বিপরীতে চাহিদা ৯ লাখ ৮৮ হাজার টন। টিএসপি মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন, যেখানে প্রয়োজন হবে ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন। অর্থাৎ টিএসপিতে ঘাটতি রয়েছে ৮১ হাজার টন।
এমওপির মজুত ১ লাখ ৮১ হাজার টন। এর বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন।
কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি মাসেই তিনটি দেশ থেকে আরও সার দেশে আসবে। ফলে মৌসুম শুরুর আগেই চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সার মজুত রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৫৭ লাখ হেক্টর। আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ হেক্টরসহ মোট ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে মোট সারের চাহিদা ধরা হয়েছে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার টন, টিএসপি ৭ লাখ ৫০ হাজার টন, ডিএপি ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টন এবং এমওপি ৯ লাখ ৫০ হাজার টন প্রয়োজন হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান অবশ্য জানিয়েছেন, দেশে কোনো সারের সংকট নেই। তাঁর দাবি, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার সারের মজুত ভালো অবস্থায় রয়েছে। কানাডা, রাশিয়া ও মরক্কো থেকে চলতি মাসের মধ্যে আরও সার আসবে।সার ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ জন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সার আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো দ্রুত সচল করে দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তাঁর মতে, একসময় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের কারখানাগুলো দেশের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া উৎপাদন করত। বর্তমানে সেই সক্ষমতা নেমে এসেছে মাত্র ২০ শতাংশে।সরকার সংকট না থাকার কথা বললেও দেশের কিছু এলাকায় কৃষকেরা বাজারে সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।
রংপুরের পোদ্দারপাড়া গ্রামের কৃষক লাল মিয়া আমন চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, জমিতে সার দেওয়ার সময় চলে এলেও বাজারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সার একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো দোকানে ইউরিয়া থাকলে টিএসপি নেই, আবার টিএসপি থাকলে ইউরিয়া পাওয়া যাচ্ছে না।
হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের কৃষক সাগর মিয়াও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ডাঙ্গীরহাট বাজারে দুই দিন ঘুরেও তিনি সার পাননি। ডিলারের কাছে গেলে সার শেষ হয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, আর খুচরা দোকানে পাওয়া গেলেও বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে।
ফলে একদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর বড় অংশ বন্ধ, অন্যদিকে আমদানি নিয়ে তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা। সরকার পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে, আমন মৌসুমে সার সরবরাহ ঠিক রাখতে উৎপাদন, আমদানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

