মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে ইয়াবার দাম। এরপর নির্দিষ্ট স্থানে দেখা করে সাধারণ করমর্দনের আড়ালে হাতবদল করা হচ্ছে ইয়াবার ছোট ছোট চালান। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজর এড়াতে ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলায় মাদক কারবারিরা এমন কৌশল নিয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা সদর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত নানা কৌশলে ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সন্দেহ এড়াতে মাদক সিন্ডিকেটগুলো কিশোর ও নারীদেরও ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ১৪ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর এবং কোলে শিশু থাকা নারীদের ঢাল হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে।
শিশুদের খেলনা, পোশাক কিংবা সাধারণ পথচারীর বেশ ধারণ করে নির্দিষ্ট গ্রাহকের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে চিহ্নিত কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর তাঁদের কেউ কেউ বাড়িতে বসে মাদক বিক্রির পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে মাদক বিক্রির কৌশল নিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এরই মধ্যে গত ১২ জুলাই নান্দাইল উপজেলার মুশল্লী ইউনিয়নের চকমতি বাজারে হেঁটে হেঁটে ইয়াবা বিক্রির সময় দিলোয়ার হোসেন নামের এক যুবককে স্থানীয়রা আটক করেন। সে সময় তাঁর সঙ্গে শিশু কোলে থাকা এক নারীও ছিলেন।
পরে নান্দাইল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ঘটনাস্থলে গিয়ে দিলোয়ারকে তিন মাসের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।
ওই সময় নারীর কাছে মাদক না পাওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁকে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছিলেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই নারী পাশের গ্রামের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী মিজানের স্ত্রী রেনুয়ারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগে তিনি বাড়িতে বসেই মাদক বিক্রি করতেন।
বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের পর তিনি এখন হেঁটে হেঁটে মাদক বিক্রি করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ইয়াবা কেনাবেচার পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতা নির্দিষ্ট একটি মোবাইল আর্থিক সেবা নম্বরে ইয়াবার মূল্য পরিশোধ করেন। এরপর নির্ধারিত স্থানে দেখা করে সাধারণ করমর্দনের মাধ্যমে ইয়াবার ছোট চালান হাতবদল করা হয়। দূর থেকে দেখলে সেখানে অবৈধ কোনো দ্রব্যের লেনদেন হচ্ছে—এমনটা বোঝার উপায় থাকে না।
এ ধরনের কৌশলের কারণে মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা। প্রকাশ্য স্থানে কিংবা হাতেনাতে মাদকসহ আটক করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক সময় মূল কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি থানার পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে। হাতেনাতে মাদক উদ্ধার বা ‘রিকভারি’ না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। মাদক ব্যবসায়ীরাও এই আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয়টি জানে। ফলে নির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও তাৎক্ষণিকভাবে মাদক উদ্ধার করা সম্ভব না হলে অনেক ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গ্রাম পুলিশ জানান, এলাকায় মাদক কারবার সম্পর্কে তাঁরা অনেক কিছু জানেন। তবে ভয়ে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে পারেন না। তাঁদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক কাজ করে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় এলাকার স্বনামধন্য পরিবারের কিশোর ও তরুণদের কেউ কেউও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিষয়টি তো নতুন জানা গেল। এখন মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করে যারা মোবাইলের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে, তাদের ব্যবহৃত মোবাইল জব্দ করে প্রযুক্তির মাধ্যমে টাকা লেনদেনের তথ্য বের করা হবে। এরপর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

