রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে (বর্তমানে শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ) ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ২২তম বার্ষিকী আজ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে চালানো ওই হামলায় ২৪ জন নিহত এবং শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান।
হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা করা হয়। মামলার তদন্ত নিয়ে তখন থেকেই নানা বিতর্ক দেখা দেয়। ২০০৭ সালে এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলা দুটির তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। ২০০৮ সালে সিআইডি হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুই মামলায় ২২ জনকে আসামি করে আদালতে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দেয়।
এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এবং পরে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ওই অভিযোগপত্রে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলা দুটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে বিচারিক আদালত ৪৯ আসামিকে বিভিন্ন দণ্ড দেন।
তবে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করেন হাইকোর্ট। এর ফলে মামলার সব আসামি খালাস পান।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছিল, নিহত ব্যক্তিদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। যথাযথ ও বিশেষজ্ঞ সংস্থার মাধ্যমে নতুন করে তদন্তের পদক্ষেপ নিতে মামলাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো উচিত বলেও পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়।
পরে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। তবে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সর্বসম্মতভাবে এ রায় দেন।
আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, ডেথ রেফারেন্স খারিজ, আসামিদের আপিল মঞ্জুর এবং বিচারিক আদালতের দোষী সাব্যস্ত করা ও দণ্ডাদেশ বাতিল করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা ন্যায়সংগত। তথ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আইনি দিক পর্যালোচনা করে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে কোনো দুর্বলতা বা বেআইনি কিছু পাওয়া যায়নি বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
একই সঙ্গে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া নতুন করে তদন্তের পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহার করেন। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আদেশের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অংশটিও বাতিল করা হয়।
আজ ২১ আগস্ট। ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলার ২২ বছর পূর্ণ হলো। হামলায় ২৪ জনের প্রাণহানি এবং শতাধিক নেতা-কর্মীর আহত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় একপর্যায়ে দণ্ডাদেশ হলেও পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের রায়ে সব আসামি খালাস পান এবং আপিল বিভাগের রায়ে সেই খালাস বহাল থাকে।

