এতদিন একটি শ্যাম্পুর প্যাকেট বা কোমল পানীয়ের বোতল ক্রেতার হাতে পৌঁছানোর পরই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেত। ব্যবহারের পর সেই প্যাকেট বা বোতল কোথায় গেল, রাস্তায় পড়ে থাকল নাকি নালায় জমল—তা নিয়ে কোম্পানির কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে এই দীর্ঘদিনের প্রথায় বড় পরিবর্তন এনেছে সরকারের নতুন একটি নীতিমালা, যার মাধ্যমে প্লাস্টিক প্যাকেজিং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ দায়ভার এখন থেকে পণ্য প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তাবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ১৩ আগস্ট এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে গেছে। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় পড়বে দৈনন্দিন ব্যবহারের বিস্তৃত পরিসরের পণ্য—প্লাস্টিকের বোতলে বিক্রি হওয়া কোমল পানীয়, জুস ও বোতলজাত পানি থেকে শুরু করে ছোট প্যাকেটে বিক্রি হওয়া শ্যাম্পু, সসের প্যাকেট এবং একাধিক স্তরযুক্ত মোড়কে বিক্রি হওয়া চিপস ও অন্যান্য নাস্তাজাতীয় পণ্য।
নির্দেশিকা অনুসারে, ভোক্তারা পণ্য ব্যবহার করার পর সেই প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত নিবন্ধন বাতিল হয়ে যেতে পারে, এমনকি কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। দেশে উৎপাদিত বা ব্যবহৃত সব ধরনের প্লাস্টিক পণ্য—পুনর্ব্যবহারযোগ্য হোক বা না হোক—এই নির্দেশিকার আওতায় পড়বে। কোম্পানিগুলো চাইলে এককভাবে অথবা যৌথভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও অপসারণের কাজ পরিচালনা করতে পারবে। তবে বিদেশি ক্রয়াদেশ পূরণে পণ্য উৎপাদনকারী রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে এই বিধিনিষেধের বাইরে রাখা হয়েছে।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হবে ধাপে ধাপে। প্রথম দুই বছরে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করা হবে, এরপর দুই বছরে মাঝারি আকারের শিল্প এবং পঞ্চম বছরে ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই আওতায় আনা হবে। তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে, যা তিন বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হলে তার নিবন্ধন পুনর্নবায়ন করা হবে না।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এই ধরনের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা প্রথম চালু করে ভারত, ২০২২ সালে। এর এক বছর পর একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে আসে পাকিস্তান, আর শ্রীলঙ্কাও একই পথে এগোচ্ছে। তবে নেপাল ও ভুটান এখনো এমন নীতিমালা প্রণয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় আট লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়—যার পরিমাণ প্রায় ২০০টি টাইটানিক জাহাজের পণ্যবহন ক্ষমতার সমান। এর মধ্যে মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
নির্দেশিকায় প্লাস্টিক পণ্যকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে শক্ত ও কাঠামোগতভাবে দৃঢ় প্লাস্টিক পণ্য, যেমন পানীয় ও প্রসাধনীর বোতল, বিভিন্ন কনটেইনার ও জার। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে নমনীয় প্লাস্টিক—শ্যাম্পুর প্যাকেট, খাবারের পাউচ, ক্যারিব্যাগ ও একাধিক স্তরযুক্ত মোড়ক। তৃতীয় শ্রেণিতে আছে স্টাইরোফোম ও এক্সপ্যান্ডেড পলিস্টাইরিনের মতো হালকা ফোমজাত পণ্য, যা সাধারণত একবার ব্যবহারযোগ্য খাবারের পাত্র ও প্লেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। চতুর্থ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে সাধারণ একবার-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য, আর পঞ্চম শ্রেণিতে রয়েছে স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াপার ও সিগারেটের ফিল্টারের মতো অন্যান্য প্লাস্টিকজাত সামগ্রী।
লক্ষ্যমাত্রার কথা বলতে গেলে, তালিকাভুক্তির প্রথম দুই বছরে প্রতিটি কোম্পানিকে তাদের উৎপাদিত বা বাজারজাত করা প্লাস্টিক প্যাকেজিং বর্জ্যের অন্তত ১৫ শতাংশ সংগ্রহ এবং সাড়ে ৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হবে কোম্পানির বার্ষিক উৎপাদন বা বাজারজাতকরণের পরিমাণের ভিত্তিতে, এবং প্রতিটি শ্রেণির জন্য আলাদাভাবে ন্যূনতম মাত্রা পূরণ করতে হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে এই লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে সংগ্রহে ৩০ শতাংশ এবং পুনর্ব্যবহারে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। কোনো কোম্পানি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বর্জ্য সংগ্রহ করলে, সেই অতিরিক্ত অংশ সরকার-অনুমোদিত পদ্ধতিতে প্লাস্টিক ক্রেডিট আকারে অন্য প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের অবকাঠামো সম্প্রসারিত হবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করা বর্জ্য সংগ্রহকারীদের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আসবে এবং দেশে একটি সার্কুলার অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি হবে। এর পাশাপাশি সমুদ্র দূষণ রোধ এবং প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণেও এই পদক্ষেপ সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া অবশ্য মিশ্র। দেশের একটি বৃহৎ প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের ২০ শতাংশের বেশি পুনর্ব্যবহার করছে বলে নতুন এই শর্ত মেনে চলতে তাদের কোনো সমস্যা হবে না। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এই শর্তগুলো ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রায় দুই দশক আগে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তখনো বড় কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে নিয়ম মেনে নিলেও ছোট কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ আজও তা পালন করে না। একই পরিণতি এই ক্ষেত্রেও হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা। তিনি পলিথিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের উদাহরণও টেনে বলেন, বছরের পর বছর পার হলেও পলিথিনের ব্যবহার এখনো নানাভাবে অব্যাহত আছে।
সংশ্লিষ্ট শিল্প সমিতির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০০টি ছোট ও মাঝারি আকারের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকারী কারখানা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর বাইরে দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীও ইতিমধ্যে পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে।
তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছেন, বাস্তবে এই বিধিমালা কার্যকর করা সহজ হবে না। একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, কোনো পরিবার একবার গুঁড়া দুধের প্যাকেট ব্যবহার করার পর সেই খালি প্যাকেট কীভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। তিনি পরামর্শ দেন, ভোক্তাদের কাছ থেকে বর্জ্য সংগ্রহে পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে, অথবা আবাসিক এলাকায় প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের জন্য আলাদা সংগ্রহকেন্দ্র চালু করা যেতে পারে। একই ধরনের মত দেন আরেকটি ভোক্তা পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, যিনি মনে করেন প্যাকেজিং সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের পুরো দায় শুধু প্রস্তুতকারকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর প্রস্তাব, গৃহস্থালি বর্জ্যকে রান্নাঘরের বর্জ্য, শুকনো বর্জ্য (প্লাস্টিক-কাগজ) এবং মানববর্জ্য—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে সংগ্রহ প্রক্রিয়া চালু করা হোক। তিনি বড় শহরগুলোতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী স্থাপনা গড়ে তোলার পরামর্শও দেন, যদিও তা ব্যয়বহুল এবং সরকারি সম্পৃক্ততা ছাড়া বাস্তবায়ন কঠিন বলে স্বীকার করেন।
প্লাস্টিক শিল্প সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের সভাপতি জানান, নতুন এই নির্দেশিকা প্রণয়নে শিল্প খাতের প্রস্তাব পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। তাঁর ভাষ্যে, তাঁরা শুরুতে স্বেচ্ছামূলকভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে তা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছিলেন। পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তাদের এই শর্ত থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবও তাঁরা রেখেছিলেন, যা চূড়ান্ত নীতিমালায় প্রতিফলিত হয়নি বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদকের দায় নির্ধারণ একটি ইতিবাচক নীতিগত পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কার্যকর সংগ্রহ অবকাঠামো তৈরি এবং ছোট ব্যবসাগুলোকে সক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া। অতীতের পলিথিন নিষেধাজ্ঞা কিংবা বর্জ্য পরিশোধন সংক্রান্ত নিয়মের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে, এই নতুন নীতিমালার প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি ও কঠোর প্রয়োগের ওপর।

