দেশজুড়ে ছয় হাজার পাঁচশ চুয়াল্লিশটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টারের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসিয়ে প্রায় তিনশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যে তিনশ সত্তর কোটি টাকা বরাদ্দ ছাড় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
বুধবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এই তথ্য জানান।
তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, এলজিইডির বিভিন্ন দপ্তর, ওয়াসা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পাশাপাশি দেশের সব হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টার মিলিয়ে মোট ছয় হাজার পাঁচশ চুয়াল্লিশটি প্রতিষ্ঠানের ছাদে এই সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে বিশেষ বরাদ্দ থেকে অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং পৃথক চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনাও পাঠানো হয়েছে। পুরো কর্মসূচি আগামী বছরের ২৭ জানুয়ারির মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এই প্যানেলগুলো থেকে দেড়শ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। তবে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি নিজস্ব রাজস্ব যোগ করে দ্বিগুণ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে, যার ফলে মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়াবে প্রায় তিনশ মেগাওয়াটে। এই বাড়তি উৎপাদনের যুক্তি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর অবশিষ্ট অংশ নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্যাকেজ অনুযায়ী প্রতি ইউনিট সাড়ে দশ টাকা দরে জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো।
এই বিক্রয়মূল্য হিসাব করে প্রতিমন্ত্রী জানান, গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে পাওয়া আয়ে তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই সরকারের বিনিয়োগ করা অর্থ উঠে আসবে। এরপর থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি একটি নিয়মিত রাজস্ব উৎসে পরিণত হবে, পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে নিরবচ্ছিন্নতাও নিশ্চিত হবে।
সোলার প্যানেল স্থাপনের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিভিন্ন সোলার কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে একটি মানসম্মত হিসাব তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সাড়ে পাঁচ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ছাদভিত্তিক প্যানেল স্থাপনে খরচ পড়বে প্রায় তিন লাখ ছাব্বিশ হাজার টাকা। এই হিসাবের ভিত্তিতেই দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার ইউনিয়ন পরিষদের ভবনে অর্থ ছাড় করা হয়েছে।
হাট-বাজার উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ থেকেও এই খাতে অর্থ ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এ জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পৃথকভাবে চিঠি পাঠিয়ে হাটের ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিভাগের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই এসব প্যানেল স্থাপন করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে ওয়ালটন, প্রাণ-আরএফএল ও গ্রামীণ শক্তিসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিমন্ত্রী জানান, নীতিমালা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কোম্পানির সঙ্গে তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে কুড়ি বছর মেয়াদি একটি চুক্তি সম্পাদন করবে, যার আওতায় পুরো মেয়াদজুড়ে বিনা মূল্যে সার্ভিসিং ও ওয়ারেন্টি সুবিধা পাওয়া যাবে। এর ফলে প্যানেলের পর্যবেক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যেকোনো ত্রুটি সারানোর দায়িত্বও থাকবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দিনের বেলায় নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে অফিস চলাকালীন লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে সাধারণ মানুষের সেবাদানকারী এসব প্রতিষ্ঠান। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও ব্যাখ্যা করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত, তাই সরকারি বরাদ্দের বাইরেও তাদের নিজস্ব আয়ের একাধিক উৎস রয়েছে—যেমন খেয়াঘাট, হাট-বাজার, পরিবহন থেকে আদায় করা কর, ট্রেড লাইসেন্স ফি ও হোল্ডিং ট্যাক্স। এসব রাজস্বের সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ যুক্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাও ব্যবহার করতে পারে এবং অতিরিক্ত অংশ বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করতে পারে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বরাদ্দের বিস্তারিত হিসাবও তুলে ধরেন। প্রায় তিন হাজার ইউনিয়ন পরিষদের জন্য মোট একশ বিশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার হিসাবে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ পাচ্ছে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে—প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কিছুটা বেশি, যাতে ভ্যাট ও আয়করের বিষয়টিও সমন্বয় করা যায়। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনগুলোর জন্য পঁচাত্তর কোটি টাকা, উপজেলা পরিষদের জন্য নিরানব্বই কোটি টাকা, পৌরসভার জন্য চৌষট্টি কোটি টাকা এবং জেলা পরিষদের জন্য বারো কোটি টাকার কিছু বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য মোট তিনশ সত্তর কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে এই সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির আওতায়।

