নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সংশোধিত ও মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় শতভাগ পাঠ্যবই সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি জানিয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ছাপাখানায় পুরোদমে চলছে। এবার বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছাপাখানা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে বই গ্রহণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে মান যাচাই করা হচ্ছে। নিম্নমানের কাগজ, মুদ্রণ ত্রুটি বা অন্য কোনো অনিয়ম যেন শিক্ষার্থীদের হাতে না পৌঁছায়, সে বিষয়ে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নজরদারি।
পাঠ্যবইয়ের মান নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে মোট ৫৩টি তদারকি দল মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। এসব দল ছাপাখানার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে বইয়ের গুণগত মান যাচাই করছে।
ইতোমধ্যে মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল করে ধ্বংস করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু ছাপাখানা নয়, মাঠপর্যায়ে বই গ্রহণের সময় কোনো অনিয়ম বা অবহেলা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের লক্ষ্য হলো নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে সম্পূর্ণ সেটের মানসম্মত ও ভুলমুক্ত বই তুলে দেওয়া।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মওলা জানিয়েছেন, চলতি বছর পাঠ্যবইয়ের মানের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় না রাখায় ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ বই বাতিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় মানসম্মত বই পৌঁছানোর জন্য মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, অতীতে ছাপাখানা ও মাঠপর্যায়ে কিছু অসাধু চক্রের অনিয়মের সুযোগ থাকলেও এবার বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব সরাসরি জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ওপর দেওয়া হয়েছে।বই বিতরণের পর কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এনসিটিবির ২২ সেপ্টেম্বরের উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল এবং কারিগরি পর্যায়ের মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই তালিকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বইও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত বছরের তুলনায় এবার বই ছাপানোর কাজ এক মাস আগে শুরু করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ছাপাখানায় বর্তমানে দ্রুতগতিতে চলছে মুদ্রণ কার্যক্রম।
প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪২ লাখ ৬৬ হাজার ২৫৩টি বই ছাপানো হয়েছে, যা মোট চাহিদার ৭৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
প্রাথমিক পর্যায়ের ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৯৯৬টি বই ছাপানো শেষ হয়েছে। অন্যদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ের ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২টি বইয়ের মধ্যে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ৪০০টি বই ছাপানো হয়েছে।
এনসিটিবির বিতরণ শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের বই ছাপানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে বানছারামপুর ও সরাইলসহ কয়েকটি উপজেলায় বই বিতরণও শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, ধাপে ধাপে দেশের সব উপজেলায় বই পাঠানো হবে এবং ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ বিতরণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।তবে ইংরেজি সংস্করণের বই এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বই জেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, সরকারের চুক্তিবদ্ধ ১১৩টি ছাপাখানার মধ্যে বর্তমানে ৯১টি ছাপাখানায় বই ছাপানোর কাজ চলছে।
বড় ছাপাখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে কাজ যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য জেনারেটরের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বইয়ের কাগজের মান, ওজন এবং মুদ্রণের গুণগত মান যাচাই করতে নিয়মিত পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। কাগজের মান নিশ্চিত করতে প্রাক-সরবরাহ পরিদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এনসিটিবির নিজস্ব তদারকিও চলছে।
সম্প্রতি নয়টি ছাপাখানা থেকে নেওয়া কাগজের নমুনা বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় এসব নমুনা নির্ধারিত মান পূরণ করেছে।
পাঠ্যবই ছাপানো ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ৫৩টি দল মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। এর মধ্যে ৩৩টি এনসিটিবি দল এবং ৭টি মন্ত্রণালয়ের দল ছাপাখানাগুলোতে সরাসরি নজরদারি করছে।
এ ছাড়া এনসিটিবি সচিবের নেতৃত্বে পাঁচটি বিশেষ দল মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। এসব দলের সদস্যরা সকাল ৯টা থেকে রাত পর্যন্ত ছাপাখানায় অবস্থান করে কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন।
এনসিটিবি জানিয়েছে, নতুন বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা ও মুদ্রণের মান নিশ্চিত করতে রাসায়নিক পরীক্ষা এবং গুণগত যাচাই করা হচ্ছে।শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, নিম্নমানের কাগজে তৈরি কোনো বই উপজেলা পর্যায়ে গ্রহণ করা হবে না।
তিনি বলেন, বাজারদর যাচাই করে বইয়ের জন্য যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কম খরচের অজুহাতে কেউ নিম্নমানের বই তৈরি করতে না পারে।মন্ত্রী আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে কোনো ছাপাখানা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানান, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বই সরবরাহের কাজ এগিয়ে চলছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই পৌঁছাতে ছাপাখানার মালিকদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন শ্রেণির প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে সম্পূর্ণ বই তুলে দেওয়াই এনসিটিবির প্রধান লক্ষ্য।
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। এবার দ্রুত মুদ্রণ, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির মাধ্যমে সময়মতো বই বিতরণ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

