দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে সুখবর হয়ে আসছে আগামীকাল রোববার পৌঁছানো একটি এলএনজি কার্গো। এটি দেশে এসে পৌঁছালে সার্বিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা। কার্গোটি যুক্ত হবে মহেশখালীতে অবস্থিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে, যা পুরোদমে সচল হলে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করতে সক্ষম হবে।
গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটার হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২২০ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে মাত্র ৫৮ কোটি ঘনফুট। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বর্তমানে দেশের সম্পূর্ণ এলএনজি সরবরাহ আসছে একটি মাত্র টার্মিনাল থেকে, কারণ অপর টার্মিনালটি গত মাসের শেষদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে বন্ধ রয়েছে। এই একক নির্ভরতার কারণেই সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে।
নরসিংদীর শিল্প এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। সেখানে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী তিন শতাধিক ছোট-বড় কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানার বড় অংশই টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, যেগুলো সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
গাজীপুরের অবস্থাও উদ্বেগজনক। সেখানকার অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ এক পিএসআইয়ের নিচে নেমে যাওয়ায় প্রায় সাড়ে চারশ গ্যাসনির্ভর কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, এসব কারখানার মধ্যে ২০ থেকে ২২ শতাংশে উৎপাদন পুরোপুরি স্থগিত রয়েছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে যেসব প্রতিষ্ঠান কোনোভাবে উৎপাদন চালু রেখেছে, তাদেরও উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
চট্টগ্রামেও গ্যাস সংকট শিল্প খাতে একধরনের অচলাবস্থা তৈরি করেছে। সামগ্রিকভাবে শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। গ্যাসের চাপ অপর্যাপ্ত থাকায় অনেক কারখানা দুই শিফটের পরিবর্তে এক শিফটে কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হচ্ছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানকে তাদের একাধিক উৎপাদন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। শহরের বায়েজিদ, অক্সিজেন ও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় অর্ধশতাধিক ছোট ও মাঝারি আকারের পোশাক, বস্ত্র, সুতা ও আনুষঙ্গিক পণ্যের কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাসনির্ভর নিটিং, ডাইং, প্রিন্টিং ও সমন্বিত টেক্সটাইল মিলগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পোশাক ও বস্ত্র খাতের বাইরে রড, সিমেন্ট ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানাগুলোও গ্যাসের অভাবে হিমশিম খাচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, আর কারখানা বন্ধ থাকায় নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কাঁচামালও।
এই পরিস্থিতিতে রোববারের কার্গোকে ঘিরে আশাবাদী শিল্পোদ্যোক্তারা। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, কার্গোটি নির্ধারিত সময়ে পৌঁছালে এবং খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল থেকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। শুরুতে সরবরাহের পরিমাণ কম থাকলেও ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে হলে ভবিষ্যতের কার্গোগুলোও নির্ধারিত সময়সূচি মেনে দেশে আসা নিশ্চিত করতে হবে।
সামগ্রিক চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক বিবেচনায় নিলে সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২২০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি, অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতির কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে আনা হয়েছে। নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া গ্যাস থেকে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
তাদের আশঙ্কা, নিয়মিত ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়াই নয়, বরং রপ্তানি আদেশ প্রতিযোগী দেশের হাতে চলে যাওয়া, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানো এবং নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখেও পড়তে হতে পারে দেশের শিল্প খাতকে। সেই কারণে রোববারের কার্গো সময়মতো খালাসের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সরবরাহ পরিকল্পনাও কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

