একটি পরিবারের চারজন মানুষ নিহত। অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যার পর অভিযুক্তরা একই বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করেছে, আবার মাদক সেবন করেছে, ঘরের খাবার খেয়েছে, লুটপাট করেছে, স্বর্ণের আসল-নকল যাচাইয়ে আগুন ব্যবহার করেছে এবং সুযোগ বুঝে পালিয়েছে।
ঘটনাটির বর্ণনা শুধু একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের গল্প নয় এটি আমাদের সমাজের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ কি শুধু বিপথে যাচ্ছে, নাকি আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যাদের কাছে বিবেক, ভয়, সম্পর্ক ও মানবিকতার অর্থ ক্রমেই মুছে যাচ্ছে?
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, অভিযুক্তরা নিহত শিক্ষককে ‘কাকা’ বলে ডাকত বলে জানা গেছে। অর্থাৎ, অভিযোগ সত্য হলে এখানে অপরিচিত কোনো শত্রুর হাতে হত্যাকাণ্ড ঘটেনি; ঘটেছে পরিচিত মানুষের হাতে। যে মানুষকে একসময় শ্রদ্ধার সম্পর্ক দিয়ে ডাকা হতো, তাকেই বাঁচিয়ে রাখার পরিবর্তে হত্যার পথ বেছে নেওয়া হলো।
তাহলে প্রশ্ন হলো- আমাদের তরুণরা কাকে ভয় পায়? আইনকে, সমাজকে, পরিবারকে, নাকি নিজেদের বিবেককেও আর ভয় পায় না?
মাদককে আমরা প্রায়ই একটি ব্যক্তিগত নেশা হিসেবে দেখি। কেউ ইয়াবা খেলে বলি, “ওর ব্যক্তিগত সমস্যা।” কিন্তু সেই নেশাগ্রস্ততা যখন নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা, লুটপাট এবং মানুষ হত্যার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন কি সেটি আর ব্যক্তিগত বিষয় থাকে? একটি তরুণের হাতে মাদক পৌঁছানোর আগে কতগুলো ব্যর্থতা কাজ করে;
পরিবারের ব্যর্থতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা, মাদক সিন্ডিকেটের শক্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতিরোধব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
আমরা কি শুধু খুনি গ্রেপ্তার করেই দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি সেই সমাজকেও খুঁজছি, যে সমাজ এমন মানুষ তৈরি করছে?
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো কীভাবে একজন মানুষ হত্যার পর স্বাভাবিকভাবে গোসল করতে পারে? খাবার খেতে পারে? আবার মাদক সেবন করতে পারে? পালানোর পরিকল্পনা করতে পারে?
এখানে কি শুধু মাদক কাজ করেছে, নাকি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের নৈতিক অবক্ষয়, অপরাধকে স্বাভাবিক ভাবার সংস্কৃতি এবং দ্রুত অর্থ পাওয়ার বিকৃত আকাঙ্ক্ষা?
আজকের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের সামনে আমরা কী আদর্শ রেখেছি?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা বিনোদন, অর্থই সফলতার একমাত্র মানদণ্ড, অপরাধীও কখনো ‘হিরো’, আর দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্নই যখন প্রধান দর্শন তখন মানবিকতা শেখাবে কে?
পরিবার কি শুধু সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে? রাষ্ট্র কি শুধু অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি শুধু পরীক্ষার ফলাফল নিয়েই ব্যস্ত থাকবে? সমাজ কি শুধু হত্যাকাণ্ড ঘটার পর ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করবে?
একটি তরুণ মাদকাসক্ত হওয়ার আগে আমরা কোথায় ছিলাম? একটি তরুণ অপরাধী হওয়ার আগে কে তাকে থামানোর চেষ্টা করেছে?
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার মাদক কখনোই অপরাধের দায় থেকে কাউকে মুক্তি দিতে পারে না। নেশাগ্রস্ততা কোনো হত্যার অজুহাত নয়। বরং মাদক যদি মানুষকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে সে পরিচিত চারজন মানুষকে হত্যা করে, লুটপাট করে এবং পরে নির্বিকার আচরণ করতে পারে তাহলে এই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আরও কঠোর ও কার্যকর করতে হবে।
শুধু বাহক বা ক্ষুদ্র বিক্রেতাকে ধরে ছবি তুললে হবে না। প্রশ্ন করতে হবে মাদক আসছে কোথা থেকে? কারা এর সিন্ডিকেট চালায়? কারা অর্থায়ন করে? আর কেন বছরের পর বছর এই ব্যবসা টিকে থাকে?
সবশেষে আসে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন। পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে পারে, তদন্ত করতে পারে, অভিযোগপত্র দিতে পারে। কিন্তু মানুষের আস্থা তখনই তৈরি হবে, যখন তদন্ত হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণ হবে শক্তিশালী এবং বিচার হবে দ্রুত ও আইনসম্মত। কারণ শাস্তির নিশ্চয়তা যত দুর্বল, অপরাধীর সাহস তত বাড়ে।
রংপুরের এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড তাই শুধু চারজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে একটি অস্বস্তিকর আয়না।
আমরা কি সত্যিই একটি তরুণ প্রজন্ম হারাচ্ছি? নাকি আমরা নিজেরাই তাদের হারিয়ে যাওয়ার সব পথ তৈরি করে দিয়েছি?
আজ একজন শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য কান্না করছি। কিন্তু আগামীকাল আরেকটি পরিবার যেন একইভাবে শেষ না হয়ে যায় সেজন্য কি আমরা সত্যিই কিছু বদলাব?
নাকি আবারও কয়েকদিন শোক, কয়েকদিন ক্ষোভ, কয়েকদিন আলোচনা তারপর নতুন কোনো হত্যাকাণ্ডের অপেক্ষা?
প্রশ্নটা শুধু রংপুরের নয়। প্রশ্নটা পুরো বাংলাদেশের আমাদের তরুণদের হাতে আমরা ভবিষ্যৎ তুলে দিচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে তাদেরই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি?

