ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ও সিল জাল করে একটি মাদরাসার প্রস্তাবিত অ্যাডহক কমিটি অনুমোদনের আবেদন করার অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৩৪ ধারায় মামলা হয়েছে। মামলার আসামি আরও অনেকে, তাঁদের ধরতে অভিযান চলছে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন তাহফিজুল কুরআনিল কারিম ফাজিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মো. নিয়ামতুল্লাহ (৫০) ও মাদরাসার কথিত উপপরিচালক (প্রশাসন) সৈয়দ সানজিদ (৪৫)। নিয়ামতুল্লাহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার কমলাকান্তপুর এলাকার মৃত কাশেম উদ্দিনের ছেলে। সানজিদ ঢাকার দক্ষিণখানের আশকোনার বাসিন্দা, তাঁর বাবার নাম সৈয়দ সাকিব হোসেন। আজ বুধবার সকালে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পুলিশ জানায়, গতকাল মঙ্গলবার ভোরে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকার ওই মাদরাসার প্রস্তাবিত অ্যাডহক কমিটির তালিকা অনুমোদনের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্যাডে একটি আবেদন তৈরি করা হয়। অভিযোগ, ওই আবেদনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সিল ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। পরে জাল স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত আবেদনটিকে আসল দলিল হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। আবেদন ও কমিটির তালিকা ঢাকার বছিলায় অবস্থিত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া হয়।
বিষয়টি রাষ্ট্রপতির নজরে এলে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট করে জানান, আবেদনে থাকা স্বাক্ষর তাঁর নয়, সেটি জাল। এরপর রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার ও ডিআইজি কার্যালয়কে বিষয়টি জানানো হয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেয়ে আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেরাজুল ইসলাম সোহাগ সঙ্গীয় পুলিশ নিয়ে অভিযান চালান। অভিযানে দুজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে কোনো এক সময় মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কার্যালয়ে বসে আসামিরা যোগসাজশে স্বাক্ষর ও সিল জাল করেন।
মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি পাঁচজন। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত বাকি তিনজন হলেন মাদরাসার পরিচালক সৈয়দ আলী রায়হান ওরফে রুন্নান, জামগড়ার গাজী লিটন ও বিপ্লব। ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ঘটনাটি শুধু একটি মাদরাসার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের স্বাক্ষর ও সরকারি সিল জাল করার অভিযোগ এটি, যা গুরুতর অপরাধ। দণ্ডবিধির যে ধারাগুলোতে মামলা হয়েছে, সেগুলো মূলত মূল্যবান দলিল জাল, প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি এবং জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
অ্যাডহক কমিটি সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হলে বা কমিটি না থাকলে সাময়িকভাবে গঠিত হয়। এই কমিটির অনুমোদন পেলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষমতা পাওয়া যায়। তাই ধারণা করা যায়, প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে পুলিশ বা এজাহারে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। কেন জাল আবেদন করা হলো এবং এতে কার কী স্বার্থ ছিল, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
এখনো কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। আবেদনটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছাল এবং সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে কী ঘটেছিল, তা জানা যায়নি। জাল সিল ও স্বাক্ষর ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং এতে বাইরের কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়েও পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অভিযোগ স্বীকার করেছেন কি না, তাও জানা যায়নি। উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগ পুলিশের ভাষ্য ও এজাহারভিত্তিক। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী বলা যাবে না।
এখন নজর থাকবে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার হয় কি না এবং রিমান্ড বা জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেদিকে। জালিয়াতিচক্রে আরও কারা জড়িত এবং এ ধরনের জাল কাগজে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কমিটি অনুমোদনের চেষ্টা হয়েছে কি না, তদন্তে তা উঠে এলে ঘটনার পরিধি বোঝা যাবে।

