চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে আনা একটি কন্টেইনারে মিলেছে পুরো একটি বিএমডব্লিউ স্পোর্টস কার, আরেকটি বিএমডব্লিউ সেডানের সামনের অংশ ও পাঁচটি হাফ-কাট ট্রাক। কাস্টমসের নথিতে যা দেখানো হয়েছিল, কায়িক পরীক্ষায় বাস্তব পণ্যের সঙ্গে তার বড় ধরনের অমিল ধরা পড়েছে। মিথ্যা ঘোষণায় গাড়ি ও গাড়ির অংশ আনার একটি বড় অনিয়ম এতে সামনে এসেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) কাছে আগাম তথ্য ছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, চালানটি খুলে পরীক্ষা করা হয়। চট্টগ্রামের হালিশহরের প্রতিষ্ঠান ‘এম/এস আয়াজ অটো ইন্টারন্যাশনাল’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আরব জাপান ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস কোম্পানি’ থেকে কন্টেইনারটি আমদানি করেছিল। চালান খালাসের দায়িত্বে ছিল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ‘আমিন (সিঅ্যান্ডএফ) প্রাইভেট লিমিটেড’।
কাস্টমসের কাগজপত্রে চালানে ডিফারেনশিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট ও পাওয়ার স্টিয়ারিংসহ নানা ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ থাকার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কন্টেইনার খুলে দেখা যায়, ভেতরের পণ্য ঘোষণার সঙ্গে মেলে না।
পরীক্ষায় কন্টেইনারের ভেতর পাওয়া যায় সিকেডি (কমপ্লিটলি নকড ডাউন) অবস্থায় ২০০৯ সালের মডেলের একটি বিএমডব্লিউ এস-ড্রাইভ ২৩আই। এটি দুই আসনের স্পোর্টস কার, ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৫০০ সিসি। গাড়িটি আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ হিসেবে ছিল না, বরং এমনভাবে খুলে আনা হয়েছিল যে, তা ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একই চালানে ছিল ২০১৬ সালের মডেলের বিএমডব্লিউ ৭৪০আই প্রিমিয়াম সেডানের সামনের অর্ধেক অংশ, যা হাফ-কাট নামে পরিচিত। গাড়িটির ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার সিসি। একটি বিলাসবহুল গাড়ির শুধু সামনের অংশ কেন এ চালানে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর বাকি অংশ অন্য কোনো চালানে গোপনে খালাস হয়েছে কি না, অথবা পরে আনার চেষ্টা চলছে কি না, সে সন্দেহও তৈরি হয়েছে।
শুধু বিএমডব্লিউ নয়, কন্টেইনারে ইসুজু ব্র্যান্ডের পাঁচটি হাফ-কাট ট্রাকও পাওয়া গেছে। এসব ট্রাকের কেবিনের ভেতরে কৌশলে আরও ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ঠেসে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ সাধারণ স্পেয়ার পার্টসের ঘোষণার আড়ালে বড় পরিমাণে গাড়ি ও গাড়ির অংশ আনা হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের ধারণা, গাড়ির অংশগুলো কেটে বা খুলে একাধিক চালানে আনা হচ্ছে এবং পরে দেশে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে পুরো গাড়ি বানানো হচ্ছে। এ ধরনের একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে তাঁদের সন্দেহ। আলাদা আলাদা চালানে গাড়ির কাঠামো এনে আসল পণ্য ও এর প্রকৃত মূল্য গোপন করে শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এটি এখনো সন্দেহের পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি।
শুল্ক ফাঁকির এ কৌশল কেন ঝুঁকিপূর্ণ, তা বোঝা কঠিন নয়। ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ও পুরো গাড়ির ওপর শুল্ক-করের হার এক নয়। পুরো গাড়ি আমদানিতে শুল্ক তুলনায় অনেক বেশি পড়ে। যন্ত্রাংশের নামে গাড়ি আনা গেলে রাজস্ব হারায় সরকার। পাশাপাশি যাচাইহীন পথে আসা গাড়ির মান ও উৎস নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। বৈধভাবে গাড়ি আমদানিকারকেরা এতে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন।
এখন কাস্টমস কর্মকর্তারা কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করছেন। উদ্ধার হওয়া গাড়ি ও অংশগুলোর ইঞ্জিন নম্বর, চ্যাসিস নম্বরসহ অন্যান্য তথ্য যাচাই চলছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের প্রকৃত শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণের কাজও চলছে। এসব তথ্য যাচাই হলে গাড়িগুলোর উৎস, মালিকানা এবং বাকি অংশ আরও কোথাও এসেছে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাস্টমস আইন ২০২৩ ও বিদ্যমান আমদানি নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএমডব্লিউ সেডানের বাকি অংশ কোথায় গেছে, সে বিষয়েও খোঁজ চলছে। চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় এ ধরনের গাড়ি বা অংশ আনা ঠেকাতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর নজরদারি আরও জোরদার করেছে।
সামনে নজর থাকবে তদন্তের ফলাফলের দিকে। আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ভূমিকা কতটা ছিল এবং আরও কোনো চালানে একই কৌশল ব্যবহার হয়েছে কি না, তা বেরিয়ে এলে সম্ভাব্য চক্রের পরিধি বোঝা যাবে। আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ চালান ধরা পড়লেও এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, কাগুজে ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে কায়িক পরীক্ষা ও গোয়েন্দা নজরদারি কতটা জরুরি।

