বাংলাদেশের কৃষির সম্ভাবনার গল্প নতুন নয়। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, সবজি, মসলা কিংবা নানা ধরনের কৃষিপণ্যের উৎপাদনে দেশ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু মাঠে উৎপাদনের সাফল্য আর বিশ্ববাজারে বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, সেটিই বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম বড় সংকট।
২০১৪ সালে বাংলাদেশি পান রপ্তানির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার ঘটনা সেই সংকটকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছিল। সালমোনেলা জীবাণুর কারণে শুরু হওয়া সমস্যাটি কৃষি উৎপাদনের ব্যর্থতা ছিল না শুধু; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় মাননিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং সনদ প্রদানের সক্ষমতার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
ফসলের সমস্যার সমাধান হয়েছিল কয়েক বছরের মধ্যে। কিন্তু কাগজের সমস্যার সমাধান করতে লেগেছে প্রায় এক দশক।
এই সেখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
একটি আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্য পাঠাতে শুধু পণ্য ভালো হলেই হয় না। প্রয়োজন হয় –
- আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষাগার
- মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
- ট্রেসেবিলিটি বা উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত তথ্যের নথি
- আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন
- জীবাণু, রাসায়নিক ও অন্যান্য নিরাপত্তা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্য সনদ
- বিভিন্ন দেশের বাজারভেদে প্রয়োজনীয় মানসম্পর্কিত তথ্য
এই শৃঙ্খলের কোনো একটি ধাপ দুর্বল হলে পুরো রপ্তানি ব্যবস্থাই আটকে যেতে পারে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের কৃষিপণ্য অনেক সময় বাজার হারায় স্বাদের কারণে নয়, দামের কারণে নয়, বরং প্রমাণ করতে না পারার কারণে।
বড় কোম্পানি পারছে, ছোটরা পারছে না
বাংলাদেশের কিছু বড় খাদ্য ও কৃষিপণ্য কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু তাদের সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ঘাটতি তারা নিজেদের অর্থে পূরণ করতে পেরেছে।
নিজস্ব পরীক্ষাগার, বিদেশি সার্টিফিকেশন প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক অডিট এবং বিশেষায়িত মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করার সামর্থ্য বড় প্রতিষ্ঠানের আছে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তার নেই।
ফলে একটি অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বড় কোম্পানি আন্তর্জাতিক মানের “কাগজ” কিনে নিতে পারে; ছোট কোম্পানি পারে না। অথচ অনেক ক্ষেত্রে ছোট প্রতিষ্ঠানের পণ্য মানের দিক থেকে খারাপ নয়। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাজার ধীরে ধীরে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
রাষ্ট্র যেখানে সবার জন্য মাননিয়ন্ত্রণ ও সনদ প্রদানের অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা ছিল, সেখানে সেই ব্যয় এখন কোম্পানির নিজস্ব ব্যবসায়িক খরচে পরিণত হয়েছে।
প্রবাসী বাজার থেকে মূলধারার বাজারে যেতে পারছে না বাংলাদেশ
বাংলাদেশি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিশ্বের বহু দেশে পাওয়া গেলেও তার বড় অংশ এখনও এথনিক মার্কেটনির্ভর।
অর্থাৎ বিদেশের বাঙালি, দক্ষিণ এশীয় বা মুসলিম কমিউনিটির দোকানগুলোই প্রধান বাজার। এই বাজারে পণ্য বিক্রি হয় পরিচিতি, নস্টালজিয়া ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে। কিন্তু ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বড় সুপারমার্কেট চেইনে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের সক্ষমতা।
সুপারমার্কেট পণ্যের গল্পে বিশ্বাস করে না; তারা বিশ্বাস করে সনদে। কারণ একটি পণ্যে সমস্যা হলে দায় শুধু উৎপাদকের নয়, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়ে। তাই বড় বাজারে প্রবেশের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার ও সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের খাদ্য রপ্তানি তাই এখনও অনেকাংশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে; মূলধারার বিশ্ববাজারের ওপর নয়।
হালাল বাজারেও একই দুর্বলতা
বিশ্বের দ্রুতবর্ধনশীল হালাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিশাল। কিন্তু এখানেও একই ধরনের সনদ সংকট রয়েছে।
একাধিক প্রতিষ্ঠান হালাল সনদ দিলেও সব দেশের কাছে সেই সনদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে বা অন্য দেশের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্যকে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হয়।
এটি একটি বিপজ্জনক নির্ভরতা। কারণ ধার করা স্বীকৃতিতে কিছু চালান রপ্তানি করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি একটি শক্তিশালী শিল্পখাত গড়ে তোলা যায় না।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির অংশীদার হতে চায়, তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নিজস্ব পরীক্ষাগার, একীভূত সনদ ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক স্বীকৃতির কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
ভর্তুকি দিয়ে দরজা খোলা যায় না
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি বাড়াতে নগদ সহায়তা বা প্রণোদনার ওপর নির্ভর করেছে। রপ্তানি করলে সরকার আয়ের একটি অংশ নগদ সহায়তা হিসেবে ফেরত দেয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো যে প্রতিষ্ঠান রপ্তানির অনুমতিই পায় না, তার জন্য প্রণোদনার অর্থ কী? রপ্তানি আয় শূন্য হলে ১০ শতাংশ প্রণোদনাও শূন্য।
অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থায় নগদ সহায়তা মূলত তাদের জন্য কার্যকর, যারা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ঢোকার সক্ষমতা অর্জন করেছে। নতুন বা ছোট উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় বাধা বাজারে প্রবেশের দরজা, সেটি খোলার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
বাংলাদেশের নীতির বড় অসামঞ্জস্য এখানেই।
রাষ্ট্র রপ্তানি হওয়ার পর টাকা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু রপ্তানি হওয়ার আগে যে প্রতিষ্ঠান, পরীক্ষাগার, সনদ ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে।
সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া এই সংকটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ যে ধরনের বাণিজ্য সুবিধা ও রপ্তানি প্রণোদনা পেয়েছে, ভবিষ্যতে তার অনেকগুলোই সীমিত হয়ে আসবে। তখন শুধু নগদ সহায়তা বাড়িয়ে রপ্তানি ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
বরং প্রতিযোগিতা করতে হবে সক্ষমতা দিয়ে।
শুল্ক সুবিধা সাময়িক হতে পারে। ভর্তুকিও একসময় কমে যেতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, স্বীকৃত সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শক্তিশালী মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামো,এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার ভিত্তি।
এই অবকাঠামো তৈরি করতে আন্তর্জাতিক কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজন রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং বাস্তব বিনিয়োগ।
চিলি ও থাইল্যান্ডের শিক্ষা
যেসব দেশ কৃষিকে বৈশ্বিক বাজারে সফলভাবে নিয়ে গেছে, তারা শুধু উৎপাদন বাড়ায়নি। তারা বাজারে প্রবেশের প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে।
চিলি ফল রপ্তানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, সরকারি মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনের সক্ষমতায় বিনিয়োগ করেছে।
থাইল্যান্ড শিল্প ও রাষ্ট্রের মধ্যে এমন কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে রপ্তানি মান রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারি দপ্তরের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি; শিল্পখাতকেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
এই দেশগুলো ভর্তুকি দিয়েছে, কিন্তু তার আগে তৈরি করেছে সক্ষমতা।
বাংলাদেশের জন্যও মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত আর কতদিন রপ্তানির পর সহায়তা দেওয়া হবে, আর কবে রপ্তানির আগে সক্ষমতা তৈরি করা হবে?
বাংলাদেশের কৃষি এখন কাগজের পরীক্ষায়
বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত উৎপাদন নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উৎপাদিত পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে না পারা।
একসময় সালমোনেলার কারণে বাংলাদেশি পান ইউরোপের বাজার হারিয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার গভীর শিক্ষা হলো জীবাণু দূর করার চেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রমাণ তৈরি করতে বেশি সময় লেগেছে।
আজ আম, মসলা, হালাল খাদ্য, প্রক্রিয়াজাত ফল কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষক উৎপাদন করতে পারেন। উদ্যোক্তা পণ্য তৈরি করতে পারেন। বড় কোম্পানি নিজেদের অর্থে আন্তর্জাতিক সনদও সংগ্রহ করতে পারে।
কিন্তু রাষ্ট্র এখনও এমন একটি সর্বজনীন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে ছোট থেকে বড় সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ তাই শুধু মাঠে নির্ধারিত হবে না। তা নির্ধারিত হবে পরীক্ষাগারে, অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডে, মাননিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানে এবং সেই সনদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতায়।
পণ্যের সংকট নয়, বাংলাদেশের বড় সংকট এখন প্রমাণের সংকট।
আর এই সংকটের সমাধান না হলে, দেশের মাঠে ফলন বাড়বে কিন্তু বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জায়গা ততটা বাড়বে না।

