চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে, যা এ পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে কম হার। গত অর্থবছরের একই সময়ে অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে এই হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সোমবার প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সবশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যেখানে গত বছর একই সময়ে খরচ হয়েছিল প্রায় সমপরিমাণ, ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অথচ চলতি বছরের পুরো এডিপিতে নিজস্ব অর্থায়নসহ মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অর্থবছরের শুরুর দিকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সাধারণত প্রস্তুতিমূলক কাজ ও পরিকল্পনা সাজাতে সময় নেয়, ফলে এ সময় ব্যয় কম থাকা অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে এবারের নিম্নমুখী হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সরকারের সাবেক একজন পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষক বলেন, বাস্তবায়নের ধীরগতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ, যার ফলে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাসে কিছুটা সময় লেগে যাচ্ছে। তাঁর মতে, নতুন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতেই সাধারণত শুরুর দিকে গতি কম থাকে। তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ভূমি অধিগ্রহণজনিত জটিলতাকেও তিনি অনেক প্রকল্পের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা সমাধানে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
দেশের একটি স্বনামধন্য উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক বলেন, বাস্তবায়নের এই নিম্নগতি উদ্বেগজনক হলেও একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তাঁর ব্যাখ্যায়, চলতি বছরের শুরুতে দায়িত্ব নেওয়া সরকার নিজেদের নীতি ও অগ্রাধিকার ঠিক করতে যথেষ্ট সময় পায়নি, তাই শুরুতে গতি কম থাকাটা প্রত্যাশিতই ছিল। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রাথমিক এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সরকারকে দ্রুত অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প চিহ্নিত করে বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে, পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
তহবিলের উৎসভিত্তিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সরকারি তহবিল থেকে ব্যয়ের হার সামান্য বেড়েছে, কিন্তু বৈদেশিক ঋণ ও অনুদাননির্ভর প্রকল্পে ব্যয় কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এ বছর সরকারি তহবিল থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ হয়েছে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ, আগের বছর যা ছিল ১ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে বৈদেশিক তহবিলের ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ, যা গত বছরের ২ দশমিক ৯১ শতাংশের চেয়ে বেশ কম।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক হিসাবে আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। মোট ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ১৭টির ব্যয়ের হার ১ শতাংশেরও নিচে, আর পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দুই মাসে এক টাকাও খরচ করতে পারেনি। এই তালিকায় রয়েছে অপেক্ষাকৃত বড় বরাদ্দ পাওয়া সেতু-সংক্রান্ত এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন-সংশ্লিষ্ট দপ্তরও। এ ছাড়া নৌপরিবহন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, পল্লী উন্নয়ন, বাণিজ্য, রেলপথ এবং পরিবেশ-বনসংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ও ১ শতাংশের নিচে ব্যয় করেছে।
সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া স্থানীয় সরকার বিভাগ মোট বরাদ্দের প্রায় ১১ শতাংশ পেলেও দুই মাসে খরচ করেছে মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ। সড়ক পরিবহন-সংশ্লিষ্ট বিভাগও বরাদ্দের সামান্য অংশ ব্যয় করেছে। বিপরীতে শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যারা বরাদ্দের সাড়ে ১১ শতাংশের বেশি ব্যয় করতে পেরেছে। অন্যদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের হার নেমে গেছে শূন্যের কাছাকাছি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি সামলাতে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন, যাতে বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ানো সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করা যায় এবং আগামী মাসগুলোতে ব্যয়ের গতি আবার বাড়ে।

