জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর বাস-লঞ্চের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। মালিকদের দাবি ও বিআরটিএর প্রস্তাবের বিপরীতে এবার নিজেদের হিসাব সামনে এনেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির প্রস্তাবে দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ৮ পয়সা, সিটি সার্ভিসের বাসে ১০ পয়সা এবং লঞ্চে প্রতি নটিক্যাল মাইলে ৫ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এক জরুরি প্রেসবার্তায় এই প্রস্তাব দেন সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। এর মধ্য দিয়ে ভাড়া বাড়ানোর প্রশ্নে মালিকপক্ষ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং যাত্রী প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি ত্রিমুখী বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে যাত্রীরা কার্যত নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য আলাদা হিসাব উপস্থাপন করছেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রস্তাবটি বিআরটিএর প্রস্তাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিআরটিএ দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং সিটি সার্ভিসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। অথচ যাত্রী সংগঠনের হিসাবে দূরপাল্লায় প্রয়োজন মাত্র ৮ পয়সা এবং সিটিতে ১০ পয়সা। এই পার্থক্যের পেছনে সংগঠনটির যুক্তি হলো, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় (যেমন স্টাফ বেতন, যন্ত্রাংশ, টায়ার, রক্ষণাবেক্ষণ) একই অনুপাতে বাড়েনি। তাই শুধু জ্বালানির বাড়তি খরচ সমন্বয়ের জন্য কম ভাড়া বাড়ানোই যুক্তিসঙ্গত। সংগঠনটি বলছে, জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সময় যে হারে ভাড়া কমানো হয়, বাড়ানোর সময় সেই একই অনুপাত মানা হয় না, এই বৈষম্যই যাত্রীদের বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিআরটিএ সদর দপ্তরে বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে বিআরটিএর ভাড়া সমন্বয় কমিটি দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা এবং মহানগর ও শহর এলাকায় ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করে। প্রস্তাবটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং সোমবার রাতেই প্রজ্ঞাপন জারির আশা করা হয়েছিল, যাতে মঙ্গলবার থেকে নতুন ভাড়া কার্যকর হয়। তবে বাস মালিকদের দাবি ছিল আরও বেশি; তারা প্রতি কিলোমিটারে ৪০ পয়সা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিলেন। মালিকদের যুক্তি, শুধু জ্বালানি নয়, সব ধরনের খরচ বেড়েছে, তাই ব্যাপক পুনর্গঠন প্রয়োজন। কিন্তু বিআরটিএ শুধু জ্বালানি খরচের সমন্বয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা মালিকদের দাবির তুলনায় অনেক কম।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির সবচেয়ে বড় অভিযোগ, ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করা হয় না। সংগঠনটির ভাষ্য, সরকারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো বাস ও লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছে, কিন্তু যাত্রীদের মতামত নেওয়া হচ্ছে না। বৈঠকের তথ্য গণমাধ্যমের কাছেও গোপন রাখা হয়। এরপর মালিক সমিতি ও সরকারের মধ্যে হওয়া সিদ্ধান্তকে সব অংশীজনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার করা হয়। যাত্রী সংগঠনটি বলছে, পরিবহন পরিচালনায় মালিকদের কত টাকা ব্যয় বেড়েছে এবং কত পয়সা ভাড়া বাড়ালে সেই ব্যয় সমন্বয় হবে; এই স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। এই অস্বচ্ছতার কারণেই সাধারণ যাত্রীরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে শুরু করেছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনের আগেই কিছু বাস মালিক কিলোমিটারপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার চট্টগ্রাম রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকায় বাস ও লেগুনায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি ভাড়া আদায় করা হয়েছে। একইভাবে রাইড শেয়ারিং ড্রাইভাররাও বাড়তি ভাড়া চাইছেন। ট্রাক ও পিকআপ চালকরা বলছেন, আগে যে ট্রিপে ৫ হাজার টাকা লাগত, এখন তাতে ৬ হাজার টাকা লাগছে। এই অবস্থায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে আগের মূল্য বহাল রাখলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতেন। সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, ‘সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে বাস মালিকরা যে পরিমাণে ভাড়া বাড়ান, তেলের দাম কমলে সে অনুযায়ী ভাড়া কমানো হয় না।’
এখন বড় প্রশ্ন হলো, ভাড়া নির্ধারণে সব পক্ষের মতামত নিশ্চিত করা যায় কীভাবে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, জনস্বার্থে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভুক্তভোগী যাত্রীদের প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় রাখতে হবে। অন্যদিকে মালিকপক্ষের দাবি, পরিচালন ব্যয় বাড়লে ভাড়া সমন্বয় ছাড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এই দুই দাবির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ পদ্ধতি চালু করা জরুরি। যেখানে জ্বালানি খরচ, পরিচালন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং যাত্রীদের ক্রয়ক্ষমতা, সব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির এই প্রস্তাব বিআরটিএর প্রস্তাবের বিপরীতে একটি পাল্টা হিসাব হিসেবে কাজ করছে, যা সরকারকে আরও সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।

