একই গাছে একই সময়ে ঝুলছে ছোট, মাঝারি ও পরিপক্ব লেবু। কোনো ডালে ফুটেছে ফুল, কোথাও দেখা যাচ্ছে মুকুল। আবার কোনো ডালে ফল পাকছে, অন্য ডালে নতুন করে ফল ধরছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে একই গাছে এমন বৈচিত্র্যময় দৃশ্য দেখা যায়।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বরিশাল উপকেন্দ্রে দেখা মিলেছে এমনই একটি জাতের লেবু গাছের। বিনা উদ্ভাবিত এই জাতের নাম বিনা-১ সিডলেস বারোমাসি লেবু।
বিনা-১ জাতের লেবুর অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো একই সময়ে গাছে ফুল, মুকুল এবং বিভিন্ন বয়সের ফল থাকা। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে গাছ থেকে লেবু সংগ্রহ করা যায়। অর্থাৎ একটি গাছ থেকেই সারা বছর লেবু পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলে লেবুর মৌসুমি সংকট এবং দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে এ জাতের চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বরিশাল উপকেন্দ্র।
বিনা রহমতপুর উপকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা—বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও ভোলা—এ বিনা-১ জাতের লেবুর চাষ সম্প্রসারণে চলতি বছর ৬ হাজার চারা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ১০টি প্রদর্শনী স্থাপন করা হবে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে ৫০টি করে চারা ও সার দেওয়া হবে। বিভাগের ছয় জেলার কৃষকদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাকি চারাগুলো বিতরণ করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাটিং ও কলম পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের কৌশল শেখানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ নেওয়া কৃষকদের অন্য কৃষকদের মধ্যেও এ জাতের চাষ ছড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
গত বছরও ৫ হাজার বিনা-১ জাতের লেবুর চারা বিতরণ করা হয়েছিল।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজান মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় লেবুর চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ না বাড়ায় এ সময় বাজারে লেবুর দামও বেড়ে যায়। অনেক সময় চারটি লেবুর এক হালি কিনতে ক্রেতাদের ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়।
তাদের মতে, সারা বছর লেবু উৎপাদন করা গেলে মৌসুমি সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষ করে একই গাছে বিভিন্ন সময়ে ফুল ও ফল আসার কারণে বারোমাসি লেবুর এই জাতটি কৃষকদের জন্য সম্ভাবনাময় হতে পারে।
রহমতপুর উপকেন্দ্রে সরেজমিনে দেখা গেছে, বিনা-১ জাতের চারা উৎপাদনের জন্য মাতৃগাছের বাগান করা হয়েছে। ওই বাগান থেকে কলম ও কাটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। পরে পর্যায়ক্রমে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার কৃষকদের মধ্যে এসব চারা বিতরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকদের চাষপদ্ধতি ও পরিচর্যা সম্পর্কেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকদের মধ্যে বিনা-১ লেবুর চাষ বাড়ানো গেলে দক্ষিণাঞ্চলে লেবুর উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করছে বিনা কর্তৃপক্ষ। এর ফলে সারা বছর বাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লেবুর সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগও তৈরি হবে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বিনা-১ বারোমাসি লেবুর জাতটি নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও কাজ করছে। এ জাতের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা বছরের বিভিন্ন সময়ে লেবু উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারবেন। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে লেবুর সরবরাহও বৃদ্ধি পাবে।
বিনার বরিশাল উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ছয়েমা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ধারাবাহিক সাফল্যের একটি হলো বিনা-১ জাতের বারোমাসি লেবু। গবেষণায় সাফল্যের পর জাতটি কৃষক পর্যায়ে বিস্তার ঘটাতে কাজ করছেন তারা।
তিনি বলেন, বিনা-১ সিডলেস বারোমাসি লেবু এমন একটি জাত, যাতে বছরের বিভিন্ন সময়ে ফুল ও ফল পাওয়া যায়। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে এ জাতের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে সারা বছর লেবুর উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
ড. ছয়েমা খাতুন আরও বলেন, লেবুর মৌসুমি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের লাভবান করার লক্ষ্যেই এ জাতের চারা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার কৃষকদের মধ্যে চারা বিতরণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
কৃষকদের মধ্যে বিনা-১ লেবুর চাষ বাড়লে ভবিষ্যতে দক্ষিণাঞ্চলের বাজারে সারা বছর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লেবুর সরবরাহ বাড়বে। এতে রমজানসহ চাহিদা বৃদ্ধির সময়ে লেবুর সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

