‘বাড়িটা ভেঙে ফেললে আমরা যাব কোথায়?’—প্রশ্নটি এখন শুধু বড়দের নয়, মিটফোর্ড হাসপাতালের সুইপার কলোনির শিশুদের মনেও ঘুরছে। যে উঠোনে প্রতিদিন খেলাধুলা, যে ঘরকে কেন্দ্র করে তাদের বেড়ে ওঠা, সেই ঠিকানাই এখন আর থাকবে কি না—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের মিনিয়াডস কোয়ার্টার, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘সুইপার কলোনি’, খালি করার জন্য নোটিশ দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নোটিশ অনুযায়ী, আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে বাসিন্দাদের আবাসন ছেড়ে দিতে হবে। একই দিন কলোনির পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও জানানো হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরোনো ভবনটি সরিয়ে সেখানে নতুন হাসপাতাল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের জন্য জায়গাটির প্রয়োজন। কিন্তু বাসিন্দাদের প্রশ্ন, উন্নয়নের প্রয়োজনে তাদের ঘর ছাড়তে হলে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা কোথায়?
কলোনির দোতলা ভবনে বর্তমানে ৬০টি কক্ষ রয়েছে। সেখানে প্রায় ২০০ মানুষের বসবাস। বাসিন্দা রিংকু শার্মার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক হরিজন সম্প্রদায়ের। কলোনিতে বসবাসকারী ৩১ জন বর্তমানে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। তাদের মধ্যে হরিজন সম্প্রদায়ের ৭ জন। এ ছাড়া এই সম্প্রদায়ের আরও ৮ জন অবসরপ্রাপ্ত হাসপাতাল কর্মচারী সেখানে থাকেন।
এই মানুষগুলোর জন্য সমস্যাটি শুধু একটি সরকারি কোয়ার্টার ছাড়ার বিষয় নয়। কয়েক প্রজন্ম ধরে এই কলোনিই তাদের ঘর, পরিচিত পরিবেশ এবং সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। অনেকে এখানেই জন্মেছেন, এখানেই পরিবার গড়েছেন, আবার এখানেই তাদের আগের প্রজন্মের মানুষদের মৃত্যু হয়েছে।
প্রায় ৬৫ বছর বয়সী মালারানি শার্মার পরিবারও এর ব্যতিক্রম নয়। তার নিজের ভাষ্য, তার আগের চার-পাঁচ প্রজন্ম এই বাড়িতে থেকেছে। তিনি নিজেও মিটফোর্ড হাসপাতালে কাজ করেছেন। তার বাবা ও কাকারাও হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
উচ্ছেদের নোটিশ পাওয়ার পর মালারানির প্রশ্ন, ‘রাস্তায় গিয়ে উঠব?’ তার কাছে এই ভবন শুধু সরকারি কোয়ার্টার নয়; এটিই তার জন্মভূমি ও জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ঠিকানা।
নোটিশ পাওয়ার পর থেকে কলোনির বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। কারণ, সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তাদের কী হবে, কোথায় থাকার ব্যবস্থা হবে—এ বিষয়ে তারা কোনো স্পষ্ট উত্তর পাচ্ছেন না।
বাসা খুঁজতেও বৈষম্যের অভিযোগ
কলোনির বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প বাসা খুঁজে নেওয়াও সহজ নয়। বাবু লালের অভিযোগ, হরিজন পরিচয় জানার পর অনেক বাড়ির মালিক ভাড়া দিতে অনীহা দেখান। পছন্দের বাসা পাওয়ার পরও পরিচয় জানাজানি হলে নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে তার দাবি।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে একই সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে এক জায়গায় বসবাস করা তাদের জন্য এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তাও তৈরি করেছে। সেই জায়গাটি হারালে নতুন এলাকায় গিয়ে আলাদা করে বসবাসের সুযোগ পাওয়া কতটা কঠিন হবে, তা নিয়েই তাদের বড় আশঙ্কা।
কলোনির বাসিন্দাদের দাবি, উচ্ছেদ যদি করতেই হয়, তাহলে আগে বিকল্প আবাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে প্রবীণ, শিশু ও শিক্ষার্থী রয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা না করে হঠাৎ আবাসন ছাড়ার নির্দেশ দিলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
অনিশ্চয়তায় শিশুদের পড়াশোনাও
উচ্ছেদের আশঙ্কার প্রভাব পড়েছে কলোনির শিশু-কিশোরদের ওপরও। বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হরিজন ও মুসলিম মিলিয়ে কলোনির ৪১ জন শিশু-কিশোর আশপাশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তাদের শিক্ষা, বন্ধু, স্কুলে যাতায়াত—সবকিছুই বর্তমান ঠিকানাকে ঘিরে।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আম্বিকা বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চায়। কিন্তু কলোনি ভেঙে দেওয়ার খবর তার পড়াশোনাতেও প্রভাব ফেলছে। তার কাছে এই কলোনি মানে বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকা, খেলাধুলা করা এবং পরিচিত একটি পৃথিবী।
১৬ বছর বয়সী রাজবীর বাল্মীকি এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। সামনে কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। আশপাশের কলেজে পড়ার পরিকল্পনা থাকলেও কলোনির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় নিজের পড়াশোনা ও থাকার জায়গা নিয়ে চিন্তিত সে। তার প্রত্যাশা, সরকার তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে, যাতে পড়াশোনা বন্ধ না হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
তবে বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের দাবির সঙ্গে একমত নয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বক্তব্য, সরকারি কোয়ার্টারে থাকার অধিকার মূলত চাকরির সঙ্গে যুক্ত। যেসব কর্মী বহু বছর আগে অবসর নিয়েছেন, তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা বংশপরম্পরায় সরকারি আবাসনে থাকবেন—এমন ব্যবস্থা হতে পারে না।
তিনি জানান, হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা পুনর্বাসনের দাবি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন এবং স্মারকলিপিও দিয়েছেন। কিন্তু হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জায়গার সংকট থাকায় সেখানেই তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ নেই।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পুরোনো ভবনটি অপসারণ করে নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ভবন অপসারণের জন্য দরপত্রের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, হাসপাতালের জায়গা সীমিত; রোগীদের চিকিৎসাসেবার জন্য অবকাঠামো সম্প্রসারণ জরুরি।
৩০ আগস্টের মধ্যে বাসিন্দারা আবাসন না ছাড়লে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়ে অবশ্য বিস্তারিত কিছু জানায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নোটিশ অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন উপপরিচালক।
ঘর হারানোর সঙ্গে আরও যে সংকট
মিটফোর্ডের এই ঘটনা হরিজন সম্প্রদায়ের আবাসন সংকটের একটি বড় বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ হরিজন ছাত্র ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ‘হরিজন সারাক্ষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা কিরন চন্দ্র বাঁসফোরের মতে, এই সম্প্রদায়ের মানুষের প্রধান সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক বৈষম্য, আবাসনের অনিশ্চয়তা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে হরিজনদের যেসব কলোনি রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর ইতিহাস কয়েক দশকের নয়; কোথাও ১০০, ১৫০ এমনকি ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে তাদের বসবাস। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প বা সরকারি স্থাপনা সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দিলে এসব দীর্ঘদিনের বসতিও উচ্ছেদের মুখে পড়ে।
অন্যদিকে, স্বল্প আয়ের কারণে অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে নিজেদের জমি কিনে বাড়ি তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে কোনো কলোনি থেকে উচ্ছেদের নোটিশ তাদের কাছে কেবল একটি ঠিকানা হারানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, কর্মসংস্থান, সন্তানদের শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
মিটফোর্ডের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেও তাই মূল প্রশ্নটি শুধু পুরোনো ভবন ভাঙা হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের জায়গা তৈরি করতে গিয়ে যাদের জীবন ও শ্রমের ইতিহাস এই হাসপাতাল প্রাঙ্গণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাদের জন্য বিকল্প নিরাপদ জীবনযাপনের ব্যবস্থা কী হবে?
যে মানুষদের পূর্বপুরুষদের একসময় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার কাজের প্রয়োজনে এখানে এনে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ সেই একই জায়গা ছাড়ার নোটিশ হাতে পেয়েছে।
৩০ আগস্টের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি—ঘরটি যদি সত্যিই ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে তারা যাবেন কোথায়?

