বাজারে প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা বেড়েছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামের মধ্যে নতুন এ মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়মিত পুষ্টির অন্যতম উৎস দুধের দাম বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক ভোক্তা। কেউ কেউ জানিয়েছেন, ব্যয় সামলাতে শিশুদের নিয়মিত দুধ খাওয়ানোও কমিয়ে দিতে হচ্ছে।
গত আগস্টে রাষ্ট্রায়ত্ত মিল্কভিটা প্রথমে পাস্তুরিত তরল দুধের দাম বাড়ায়। প্রতিষ্ঠানটির এক লিটারের প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা এবং আধা লিটারের দাম ৫৫ টাকা থেকে ৬০ টাকা করা হয়। একই সঙ্গে কৃষক পর্যায়ে ন্যূনতম ৪ শতাংশ ফ্যাটযুক্ত দুধের সংগ্রহমূল্য লিটারপ্রতি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৩ টাকা করা হয়।
এর প্রায় দেড় মাস পর বেসরকারি দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও দাম বাড়িয়েছে। বাজারে ফার্ম ফ্রেশ, আড়ং ডেইরি ও প্রাণসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এক লিটার তরল দুধ এখন ১১০ থেকে ১১৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। আধা লিটারের প্যাকেটও ব্র্যান্ড ও ধরনভেদে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দাম বাড়ায় কমছে বিক্রি
দুধের নতুন দাম নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন ক্রেতারা। তাদের ভাষ্য, দুধ একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর খাদ্য হলেও ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে নিয়মিত দুধ কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর রামপুরায় দুধ কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, ছোটবেলা থেকেই দুধকে সুষম খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জেনে এসেছেন। তাই একবারে এতটা দাম বাড়ানো যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছেন না তিনি।
আরেক ভোক্তা জানিয়েছেন, আগে তিনি তাঁর শিশুকে নিয়মিত দুধ খাওয়াতেন। কিন্তু নতুন দামের কারণে সেই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ায় নিয়মিত দুধ দেওয়া বন্ধ করতে হয়েছে।
খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, দাম বাড়ার পর প্যাকেটজাত তরল দুধের বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রায় সব বড় ব্র্যান্ড কাছাকাছি সময়ে দাম বাড়ানোয় ক্রেতাদের বিকল্পও সীমিত হয়ে পড়েছে।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি কোম্পানিগুলোর
দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, কাঁচা দুধ সংগ্রহের মূল্য, পশুখাদ্য, প্যাকেজিং, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খুচরা দাম সমন্বয় করা ছাড়া উপায় ছিল না।
মিল্কভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল জানিয়েছেন, বিশেষ করে প্যাকেজিং উপকরণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গ্যাসের সংকট ও উচ্চমূল্যের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচও প্রতিষ্ঠানটির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
মিল্কভিটার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের কাছ থেকে দুধ কেনার দামও লিটারপ্রতি ৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাড়তি ব্যয় সামাল দিয়েই দুধের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও একই ধরনের যুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, প্যাকেটজাত দুধের খুচরা মূল্যের বড় অংশ কৃষকদের পাওনা হলেও এর সঙ্গে দুধ সংগ্রহ, পরিবহন, শীতলীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও যুক্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এসব খরচ বেড়েছে।
পুষ্টির খরচ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দামও যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন তরল দুধের নতুন মূল্য পরিবারগুলোর মাসিক খাদ্য ব্যয়ে আরও চাপ যোগ করেছে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য দুধ সহজলভ্য পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নেতারা বলেছেন, প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে তা এমন পরিবারগুলোর ওপর বেশি প্রভাব ফেলে, যাদের আয় খাদ্যপণ্যের দামের সঙ্গে সমান হারে বাড়ে না।
ভোক্তাদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে থাকলে তার যৌক্তিকতা ও মূল্য নির্ধারণের হিসাব স্বচ্ছভাবে জানানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষক যেন ন্যায্য মূল্য পান এবং সাধারণ মানুষের কাছেও দুধ যেন ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে—দুই দিকেই নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

